সকালবেলার নরম রোদ জানালার ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করছিল। বিশাল নতুন ফ্ল্যাট কমপ্লেক্স, যেখানে প্রতিটি ফ্ল্যাট একে অপরের প্রতিচ্ছবি। এক পাশে ছিল অভিজিতের ফ্ল্যাট, আর অন্য পাশে সদ্য নতুন ভাড়া নেওয়া এক দম্পতির ফ্ল্যাট। অভিজিৎ একা থাকত, কলকাতার ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে এসে স্থায়ী ঠিকানা বানিয়েছিল এই নতুন এলাকায়। ওয়ার্ক ফ্রম হোম করার সুবাদে অনেক সময় ঘরে একাই কাটত তার।
একদিন সকালে শেভ করতে করতে হঠাৎই তার চোখ পড়ল সামনের ফ্ল্যাটের জানালার দিকে। ওখানেও একটা জানালা খোলা ছিল, আর ঝাপসা কাঁচের ওপাশে দেখা যাচ্ছিল এক নারীর অবয়ব। লম্বা চুল, সুঠাম গড়ন—শুধু অবয়বেই বোঝা যাচ্ছিল, ও পাশের মানুষটি এক নারী।
সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল, কিন্তু কাঁচের ঝাপসা ভাবের কারণে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। কৌতূহল একটু বাড়লেও, সে আবার নিজের কাজে মন দিল। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখ আবার চলে গেল ওই জানালার দিকে। এবার আর ঝাপসা জানালার আড়ালে নয়, সোজা তার ফ্ল্যাটের সামনের জানালার পর্দা সরিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এক মহিলা।
নেহা!
গায়ে শুধু একটা তোয়ালে জড়ানো, ভেজা চুল কাঁধে এলোমেলো ভাবে পড়ে আছে। মেয়েটি নিশ্চয়ই স্নান করে বেরিয়েছে, এবং তার ঘরের পর্দা টানার কথাটা মনেই ছিল না। অভিজিৎ বোকার মতো তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। নেহার ত্বক কেমন চকচক করছিল, যেন সূর্যের আলোয় সোনালী আভা পড়েছে। সে জানত, এভাবে কারও দিকে তাকানো ঠিক নয়, কিন্তু দৃষ্টি সরাতেও পারছিল না।
নেহা ধীরে ধীরে তোয়ালেটা খুলে বিছানার ওপর রাখল। অভিজিৎ মনে মনে শপথ করল, এবার চোখ সরাতেই হবে। কিন্তু শরীর যেন অবশ হয়ে গেল তার। নেহার ঘরটা একদম তার ঘরের উল্টো দিকে, দূরত্ব খুব বেশি নয়। এতটা কাছ থেকে সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল, নেহার নিটোল ত্বক, কমনীয় শরীর, আর নিখুঁত বাঁক।
কিছুক্ষণ পর নেহা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে লাগল। এরপর একটা লাল শাড়ি বের করল আলমারি থেকে। শাড়িটা পরে সে আয়নার সামনে ঘুরে দাঁড়াল, তারপর একবার জানালার দিকে তাকাল।
সরাসরি অভিজিতের চোখের দিকে!
তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। তবে আশ্চর্যজনকভাবে, নেহার চোখেমুখে বিরক্তি ছিল না। বরং একটা রহস্যময় হাসি খেলে গেল তার ঠোঁটের কোণে।
সেদিন রাতে অভিজিৎ ঠিক করল, নেহার সাথে একটু কথা বলা দরকার। এতদিন শুধু দূর থেকে দেখেছে, কিন্তু আজকের পর তার মনে হলো, তাদের মধ্যে অদৃশ্য একটা যোগসূত্র তৈরি হয়েছে।
প্রথম দেখা
পরের দিন সন্ধ্যায়, ফ্ল্যাটের নিচে পার্কিং লটে দেখা হয়ে গেল নেহার সাথে। অভিজিৎ একটু দ্বিধায় ছিল, কিন্তু নেহা যেন খুব স্বাভাবিক ভাবেই এগিয়ে এলো।
“আপনি নতুন এসেছেন, তাই না?”
অভিজিৎ একটু হেসে বলল, “হ্যাঁ, মাস ছয়েক হলো।”
“আমি নেহা। এই ফ্ল্যাটেই থাকি, আমার স্বামীর সাথে।”
স্বামী! কথাটা শুনে অভিজিতের বুকের ভেতর কেমন যেন শূন্যতা তৈরি হলো।
“আমি অভিজিৎ।”
নেহা হেসে বলল, “কাল আপনাকে দেখেছিলাম, জানালার ওপারে।”
এমন খোলাখুলি স্বীকারোক্তি শুনে অভিজিৎ কিছুক্ষণ চুপ করে গেল।
“আমি… আসলে…”
“উহু! কিছু বলার দরকার নেই।” নেহা তার হাত দিয়ে অভিজিতের বাহুতে আলতো করে স্পর্শ করল। “মানুষের চোখ সবসময় সেখানেই আটকে যায়, যেখানে কিছু আকর্ষণীয় থাকে।”
এই বলে সে চলে গেল, তার শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ে উঠল এক মুহূর্তের জন্য।
নিষিদ্ধ আকর্ষণ
এরপর থেকে দেখা হওয়াটা যেন এক অদ্ভুত খেলা হয়ে দাঁড়াল। জানালার ও-পার থেকে একরকম ইঙ্গিতপূর্ণ চোখাচোখি, সিঁড়ির মোড়ে আচমকা দেখা হয়ে যাওয়া, কিংবা একসাথে লিফটে উঠলে নিঃশব্দ কিছু মুহূর্ত।
একদিন রাতে অভিজিৎ বারান্দায় বসে ছিল, আর তখনই পাশের বারান্দা থেকে ফিসফিস করে একটা ডাক এল।
“অভি…”
সে চমকে তাকাল। নেহা দাঁড়িয়ে ছিল, হালকা নীল রঙের একটা নাইটি পরে। চুল খোলা, চোখে এক অদ্ভুত ঝলক।
“কী করছিলেন?”
“কিছু না… একটু হাওয়া খাচ্ছিলাম।”
“আমিও।”
নিঃশব্দ কিছু মুহূর্ত পেরিয়ে গেল। নেহা একবার চারপাশ দেখে নিয়ে আস্তে আস্তে বলল, “আমার স্বামী এখন বাইরে গেছে, ফিরতে রাত হবে।”
অভিজিৎ অনুভব করল, তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে।
“আমি একা থাকা একদম পছন্দ করি না,” নেহা বলল, তার কণ্ঠে কেমন যেন দুষ্টুমি মেশানো ছিল।
এই কথাটাই যেন সীমারেখা মুছে দিল।
সীমানার ওপারে
রাত বাড়ার সাথে সাথে, অভিজিৎ নিজের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে নেহার ফ্ল্যাটের দিকে তাকাল। মিনিট খানেক পর, নেহা নিজেই দরজা খুলে দিল।
ভেতরে ঢুকতেই নেহা ধীরে ধীরে দরজা বন্ধ করল।
“আমি জানতাম, তুমি আসবে,” সে ফিসফিস করে বলল।
তারপর কোনো কথা না বলে, এক মুহূর্তের মধ্যে অভিজিতের ঠোঁটের ওপরে নিজের ঠোঁট চেপে দিল।
নিষিদ্ধ আকর্ষণ, প্রতিরোধহীন অভিসার—সব মিলিয়ে এক গভীর রাতের শুরু।
শেষ অধ্যায়
ভোরের দিকে, অভিজিৎ নেহার বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে সূর্যের প্রথম আলো পড়ছিল তাদের দুজনের ওপর।
নেহা বিছানায় শুয়ে থেকে বলল, “এখন কী হবে?”
অভিজিৎ জানত, এই সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু এও জানত, এমন রাতগুলো বারবার ফিরে আসবে, যতক্ষণ না কেউ বাধা সৃষ্টি করে।
নেহা ধীরে ধীরে তার বিছানার পাশে রাখা আংটিটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল।
“আমি কখনও চাইনি, কিন্তু আমার জীবনটা এমনই,” সে বলল, বিষাদভরা কণ্ঠে।
অভিজিৎ তার হাত চেপে ধরল।
“আমরা যা করেছি, তার জন্য হয়তো অনুশোচনা হবে, কিন্তু এই মুহূর্তটা তো সত্যি, তাই না?”
নেহা একটুও দ্বিধা না করে বলল,
“হ্যাঁ, একদম সত্যি।”
(সমাপ্ত)
Concept Arts






মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন