স্বপ্নের রাত
প্রতিদিন কি আর দরজা খুললেই দেখা মেলে মিস্টার ব্যানার্জী'র?
ইন্দ্রানী দরজা খুলেই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড আগে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল সে, কিন্তু লোকটা তখনও দাঁড়িয়ে, কিছুটা অবাক হলেও শালীনতার একটুও অভাব নেই তার ব্যবহারে।
"ইন্দ্রানী পাল?"
ইন্দ্রানী একবার তার নিখুঁত স্যুট, উজ্জ্বল সাদা ক্রাভাট, ক্লাসিক প্যান্ট আর স্মার্ট হাসির দিকে তাকিয়েই অস্ফুট স্বরে বলল, "জি-জি..."
লোকটা হাসল। "দারুণ! আমি তোমার স্বপ্নের ডেট।"
ইন্দ্রানী চোখ কচলে দেখল। ভুল নয় তো? স্বপ্ন নয় তো? হঠাৎ তার মনে পড়ল, সে সত্যিই একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল, যেখানে বিজয়ী পাবে এক রাতের স্বপ্নের সঙ্গী!
তার হাতে এক গুচ্ছ লাল গোলাপ তুলে দিয়ে লোকটা বলল, "তুমি কি নিশ্চিত, চিঠিটা পেয়েছিলে?"
ইন্দ্রানীর মনে পড়ল, কয়েকদিন আগে তার কুকুরটা কাগজের গোছা চিবিয়ে ফেলেছিল। নিশ্চয়ই সেই চিঠিও ছিল তার ভেতর! কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, "হ্যাঁ, পেয়েছি!"
লোকটার মুখে স্বস্তির হাসি ফুটল। "কিন্তু তোমাকে দেখে খুব উত্তেজিত মনে হচ্ছে না?"
ইন্দ্রানী দ্রুত নিজের সাধারণ টিশার্ট আর জিন্সের দিকে তাকিয়ে বলল, "ওহ, এটা! আসলে আমি ছেলেমেয়েদের বিদায় করেই রেডি হব ভেবেছিলাম। তুমি বসো, আমি মিনিট দশেকের মধ্যেই নামছি।"
"নিশ্চিন্তে থেকো," লোকটা বলল। "আমি আজ তোমার অনুগত সঙ্গী।"
ইন্দ্রানীর শিরদাঁড়া দিয়ে শিহরণ বয়ে গেল!
সে তাড়াহুড়ো করে ছেলেমেয়েদের বিদায় করল। ছেলে রাফি আর মেয়ে স্নিগ্ধা'কে একরাতের জন্য বন্ধুদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিল। কুকুরটাও গেল সাথে, তার প্রিয় বিস্কুটের বস্তা নিয়ে।
সবাই বিদায় হতেই ইন্দ্রানী ছুটল আলমারির দিকে। কি পরবে? স্বপ্নের রাতের জন্য কি মানায়? তার চোখ গিয়ে পড়ল একটা হালকা সোনালি কাজ করা এম্পায়ার স্টাইলের গাউন-এ। সাথে মিলিয়ে নিল রূপার গয়না আর কাশ্মিরি শাল।
নিচে নামতেই মিস্টার ব্যানার্জী উঠে দাঁড়াল।
"তুমি অপূর্ব লাগছো," সে বলল, চোখে মুগ্ধতার ছোঁয়া।
সে ধীরে ধীরে এক হাতে একটা গোলাপ নিয়ে তার চুলের পাশে গুঁজে দিল।
ইন্দ্রানীর বুক ধুকপুক করে উঠল!
লিমোজিনের ভেতর ছিল মৃদু সুরের গান, চকচকে চামড়ার আসন আর এক বোতল ফ্রেঞ্চ শ্যাম্পেন।
"একটু শ্যাম্পেন হবে?" লোকটা জিজ্ঞেস করল।
ইন্দ্রানী ইতস্তত করলেও একবার গ্লাস তুলে নিয়ে চুমুক দিল। উষ্ণতা যেন তার শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ল।
"তুমি কি এটা প্রায়ই করো?"
লোকটা মুচকি হাসল। "বস্তুত না। সুন্দরী নারীদের স্বপ্নের রাত উপহার দেওয়ার সুযোগ খুব কমই পাই।"
ইন্দ্রানীর মুখ রাঙা হয়ে উঠল।
রেস্তোরাঁ ছিল অভিজাত গুলশানের এক পাঁচ তারকা হোটেলে। ঢাকার ব্যস্ত রাতের বাতাসে ছড়িয়ে ছিল সুবাসিত আলোর ছটা।
তারা একসঙ্গে প্রবেশ করতেই চারপাশে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলসে উঠল। প্রতিযোগিতা আয়োজকেরা তার বিজয়ের মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করল।
খাবার এল একের পর এক—
চিজ কাবাব, মধুর লবঙ্গের সুগন্ধে ভরা বিরিয়ানি, সফট চকলেট মুজ।
মিস্টার ব্যানার্জী প্রতিটি খাবার নিজের হাতে তুলে খাইয়ে দিল।
"তোমার স্বপ্ন কী?" ইন্দ্রানী হঠাৎ জানতে চাইল।
লোকটা হাসল। "সত্যিকারের সুখ চাই। একটা ঘর, এক কাপ চা, বাচ্চার খেলনা ছড়ানো ঘর আর এমন এক সঙ্গী—যে অভিমান করে বসে থাকবে ভালোবাসার অভাব বোধ করলে।"
ইন্দ্রানীর বুক হালকা ব্যথায় ভরে উঠল।
রাত বাড়ল। ব্যালকনির দরজা খুলে গেল। আলো-ছায়ায় মোড়া ঘাসের উপর তারা দু’জন নেমে এল।
মিস্টার ব্যানার্জী তার কোমর জড়িয়ে নিল।
"একটা বিদায়ী চুম্বন চলবে?"
ইন্দ্রানী নিঃশ্বাস ফেলল।
"হ্যাঁ..."
তারা চুম্বনে আবদ্ধ হলো। শ্যাম্পেন, চকোলেট, আর রজনীগন্ধার গন্ধ মিলেমিশে গেল। তার আঙুল লোকটার চুলের ভেতর হারিয়ে গেল, হাতে জমে থাকা লাল গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে।
সকালের আলোয়
ইন্দ্রানী ধীরে ধীরে চোখ খুলল। মাথা ভারী লাগছে, যেন রাতটা স্বপ্নের মতো কেটেছে।
সে পাশে তাকাল— উষ্ণ এক শরীর!
তার স্বামী নিলয়!
শরীর হিম হয়ে গেল! তাহলে কি সত্যিই...?
সে হাত বাড়িয়ে নিলয়ের উষ্ণ শরীর ছুঁয়ে দেখল।
নিলয় তার দিকে ফিরে হাসল।
"শুভ সকাল, ভালোবাসা। কাল রাতে তুমি আমায় অবাক করে দিলে। এতটা উন্মত্ত অভ্যর্থনা আগে কখনো পাওনি!"
ইন্দ্রানী শ্বাস নিল।
"তুমি ফিরলে কখন?"
"রাত বারোটার পর। তুমি দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলে, একগুচ্ছ গোলাপ হাতে। এরপর..."
নিলয় আবার কাছে টানল। "চলো, আবার মনে করিয়ে দিই!"
ইন্দ্রানী জানবে না কখনো।
সে কি আসলেই স্বপ্নের রাতে হারিয়ে গিয়েছিল?
নাকি তার স্বপ্নই ফিরে এসেছিল বাস্তবে?
💖 শেষ 💖

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন