
#অদ্ভুত অনুরোধ#
“মিস তানিশা?”
বাবার দীর্ঘদিনের সহকারী অবশেষে আমার নাম ধরে ডাকল। আমি সেনাবাহিনীর ঘাঁটিতে এসেছি সকালবেলায়, কিন্তু এক ঘণ্টারও বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছে!
আমি রুমে ঢুকতেই বাবা বলল, “তানিশা!”
তার অফিসে সব জায়গায় সামরিক সরঞ্জাম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, কোণায় বাংলাদেশের পতাকা গর্বের সাথে উড়ছে।
“কি ব্যাপার, কর্নেল?” আমি কোনোদিন তাকে ‘বাবা’ বলে ডাকিনি, সবসময় তার পদবিই ব্যবহার করেছি।
তিনি কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বললেন, “তোমার কাছে একটা অনুরোধ আছে।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “কী অনুরোধ?”
“তুমি তো জানো ‘একজন সৈনিককে চিঠি লিখুন’ প্রোগ্রামের কথা?” আমি মাথা নাড়ালাম। “কিছু সৈনিক আছে যাদের পরিবার নেই বা কেউ তাদের খবর রাখে না। মনোবল ঠিক রাখতে যদি তুমি এবং তোমার বন্ধুরা তাদের জন্য চিঠি লেখ, তাহলে ওরা মানসিকভাবে শক্ত থাকবে।”
“মানে, কলম বন্ধু?” আমি অবাক হলাম।
“হ্যাঁ,” বাবা হালকা হাসলেন।
এটা অদ্ভুত অনুরোধ, কিন্তু যদি এতে একজন সৈনিকের মনোবল বাড়ে, তাহলে কেন নয়?
“ঠিক আছে, কর্নেল। আমি আমার স্কুলের কিছু সহকর্মীকেও জানাবো।”
বাবা খুশি হলেন। “চমৎকার! আমি তোমাকে কিছু নামের তালিকা দিচ্ছি।”
আমি অবাক হলাম। এটা তো বেনামী হওয়ার কথা, তাই না? তবুও ফাইলটা নিয়ে চলে এলাম।
#অজানা ঠিকানায় চিঠি#
বাসায় ফিরে এসে ফাইল খুললাম।
তালিকায় শুধুমাত্র পদবি, ঘাঁটির নাম, বয়স, লিঙ্গ, আর কিছু তথ্য দেওয়া ছিল। কিন্তু কোনো নাম নেই।
“বাচ্চাদের দিয়ে চিঠি লিখালে কেমন হয়?” আমি ভাবলাম। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এটি ভালো কাজ হতে পারে। কিন্তু নাম না থাকলে বাচ্চারা কাকে উদ্দেশ্য করে লিখবে?
আমি নিজেই শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
একটি কাগজ নিয়ে চোখ বন্ধ করে এলোমেলোভাবে একটি তথ্য পাতা তুললাম।
চোখ খুলে পড়তে শুরু করলাম, “পুরুষ, প্লাটুনের ক্যাপ্টেন, কক্সবাজার থেকে, বয়স ৩৭, কোনো নির্দিষ্ট স্টেশন কমান্ড নেই।”
আমি হেসে ফেললাম, “অবশ্যই কক্সবাজার! সৈকতের ছেলে!”
আমি কলম হাতে তুলে নিলাম এবং লেখা শুরু করলাম—
“প্রিয় ক্যাপ্টেন,
আমি জানি না আপনি কে, কিন্তু যদি এই চিঠিটা আপনার হাতে পৌঁছায়, তাহলে এটুকু জানবেন যে কোনো এক অচেনা মানুষ আপনাকে মনে করে লিখছে।
আপনার জীবন কেমন কাটছে? আপনি কি সমুদ্রের ঢেউ মিস করেন? কক্সবাজারের সেই মুক্ত বাতাসের কথা কি মনে পড়ে? আমি শহরের ব্যস্ত জীবনে থাকি, যেখানে আকাশের রঙও যেন কৃত্রিম হয়ে গেছে।
আপনার যদি ইচ্ছে হয়, আমাকেও কিছু লিখতে পারেন।
শুভ কামনায়,
তানিশা।”
#প্রত্যুত্তর#
আমি ভাবিনি ক্যাপ্টেন আমাকে লিখবে। কিন্তু তিন সপ্তাহ পর ডাকবাক্স খুলে দেখি, একটি চিঠি!
হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। তারপর কাগজটা খুললাম—
“প্রিয় তানিশা,
তোমার চিঠি পেয়ে অবাক হয়েছি। একজন অচেনা মানুষ যে আমার কথা ভাবে, এটা নতুন অভিজ্ঞতা।
হ্যাঁ, আমি কক্সবাজারের ছেলে। সমুদ্রের ঢেউ আমার জীবনের অংশ। ঢাকার ব্যস্ত জীবনের কথা শুনে বুঝতে পারছি, তুমি অনেক কষ্ট করছ।
তোমার ছাত্রছাত্রীরা কেমন? তাদের কি সমুদ্রের গল্প বলো?
আমি আশা করি, তুমি আবার আমাকে লিখবে।
শুভেচ্ছাসহ,
ক্যাপ্টেন আদনান।”
আমি মুচকি হেসে চিঠিটা বুকের কাছে রাখলাম।
এভাবেই শুরু হলো আমাদের কলম বন্ধুত্ব।
#অনুভূতির গভীরে#
আমাদের চিঠির লেনদেন চলতে লাগল।
আমি আমার ছাত্রদের কথা লিখতাম, তিনি তার সেনা জীবনের কঠিন মুহূর্তের কথা শেয়ার করতেন।
একদিন তিনি লিখলেন—
“তানিশা, তোমার চিঠিগুলো পড়ার পর মনে হয়, তুমি যদি এখানে থাকতে, তাহলে এই নিষ্ঠুর বাস্তবতাও সহনীয় লাগত।”
আমি বুঝতে পারলাম, আমারও তার চিঠিগুলোর জন্য অপেক্ষা থাকে।
একদিন আমি লিখলাম—
“তুমি কি কখনো ভেবেছো, যদি আমরা একই জায়গায় থাকতাম, তাহলে কেমন হতো?”
তিন সপ্তাহ পর উত্তর এলো—
“আমি শুধু ভেবেছি না, কল্পনাও করেছি। আমি যদি ঢাকায় থাকতাম, তাহলে হয়তো একদিন স্কুলের বাইরে দাঁড়িয়ে তোমার ক্লাস শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতাম।”
আমার বুকের ভেতর শিহরণ জাগল।
# প্রথম দেখা#
একদিন তিনি লিখলেন—
“আমি ছুটিতে ঢাকায় আসছি। দেখা হবে?”
আমি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম। চিঠির মানুষকে বাস্তবে দেখা কি ঠিক হবে?
কিন্তু মন মানছিল না।
আমরা ধানমন্ডির এক ক্যাফেতে দেখা করলাম।
আমি তাকে দূর থেকে দেখেই চিনতে পারলাম—গম্ভীর মুখ, আত্মবিশ্বাসী চোখ, আর সামরিক শৃঙ্খলা।
কিন্তু যখন সে হাসল, তখন মনে হলো, আমি যেন তাকে চিনি বহু বছর ধরে।
আমাদের কথোপকথন সহজ ছিল, ঠিক যেমন চিঠিতে হতো।
কিন্তু বিদায় নেওয়ার সময়, সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল—
“তানিশা, আমি চাই না এই সম্পর্ক শুধু চিঠির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুক।”
আমার হৃদয় জোরে ধুকপুক করছিল।
# ভালোবাসার পথ#
আদনান আবার মিশনে ফিরে গেল, কিন্তু এবার আমরা শুধু চিঠিতেই সীমাবদ্ধ থাকলাম না, ফোনেও কথা বলতে লাগলাম।
আমি বুঝতে পারলাম, আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
একদিন ফোনে সে বলল,
“তানিশা, আমি চাই তুমি আমার জীবনের অংশ হও। তুমি কি রাজি?”
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “আমি তো তোমার হয়েই আছি, আদনান।”
# ভালোবাসার পূর্ণতা#
আদনান মিশন শেষ করে ফিরে এলো।
তারপর আমরা পরিবারকে জানালাম।
বাবা, যে কখনো আমাদের সম্পর্কে জানত না, সে শুনে অবাক হলেন, কিন্তু খুশিও হলেন।
এক বছর পর, আমাদের বিয়ে হলো।
আমি একজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, এবং সে একজন শিক্ষকের স্বামী।
আমাদের ভালোবাসার গল্প এক টুকরো কাগজ থেকে শুরু হয়ে জীবনের পথে গাঁথা হয়ে গেল।
শেষ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন