সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

প্রেমের অপেক্ষা

b32afb6a-7825-4889-a048-0a63f1624dc8

গ্রামের নাম ছিল শ্যামপুর। সবুজ ধানখেত, সরু কাঁচা রাস্তা আর সন্ধ্যায় মিটিমিটি জ্বলতে থাকা প্রদীপের আলোয় গাঁথা এক চিরচেনা গ্রাম। এই গ্রামেই বাস করত অরুণ। অরুণের বাবা ছিলেন একজন কৃষক, অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু অভাব কখনো তার মনোবল ভাঙতে পারেনি। পড়াশোনার প্রতি তার ছিল অসম্ভব টান। দিনভর মাঠে বাবার সঙ্গে কাজ করত, আর রাতে কুপি জ্বালিয়ে বই নিয়ে বসত।

অরুণের কঠোর পরিশ্রম আর ভালোবাসা তার চোখে স্বপ্ন এঁকে দিয়েছিল—সে একদিন বড় কিছু হবে। কিন্তু সে স্বপ্নেও ভাবেনি, তার জীবনে এক আশ্চর্য প্রেম এসে পড়বে, যা তার জীবন বদলে দেবে।

অরুণের প্রেম এলো অপ্রত্যাশিতভাবে। গ্রামের প্রধান হরিপদ রায়ের একমাত্র মেয়ে, চন্দনা। ধনীর দুলালী, একরোখা স্বভাবের মেয়ে, কিন্তু মনটা ছিল সোনার মতো। সে ছিল গ্রামের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে, চোখের তারায় ঝিলমিল আলো।

চন্দনার অরুণকে প্রথম দেখা হয়েছিল এক বিকেলে, যখন সে মাঠের ধারে বসে বই পড়ছিল। তখন বাতাসে ধানের গন্ধ, আর সূর্য তখনও আধভেজা কমলারঙা। চন্দনা হেসে বলেছিল,

— "তুমি এত পড়ো কেন?"

অরুণ চমকে উঠে বলেছিল,

— "স্বপ্ন দেখতে ভালো লাগে।"

চন্দনা তখনো বুঝতে পারেনি, এই ছেলেটাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবে।

প্রতিদিন দেখা হতে লাগল। কখনো নদীর ধারে, কখনো গ্রামের মেলায়, কখনোবা স্কুলের পথে। চন্দনা প্রথম অনুভব করল, তার হৃদয়টা যেন অরুণের জন্য ধুকপুক করছে। সে প্রথম প্রেমে পড়ল।

কিন্তু অরুণ? সে জানত, তারা দুই ভিন্ন জগৎ‌র মানুষ। হরিপদ রায় কখনোই মেনে নেবেন না তার মেয়ের সঙ্গে একজন গরিব কৃষকের ছেলের সম্পর্ক। তাই অরুণ নিজেকে সরিয়ে রাখতে চাইল।

কিন্তু চন্দনা হাল ছাড়ার মেয়ে নয়। একদিন সে অরুণকে বলল,

— "তুমি আমায় ভালোবাসো, তাই না?"

অরুণ চুপ।

— "সত্যি করে বলো!"

অরুণ আস্তে করে বলল,

— "ভালোবাসি। কিন্তু আমাদের এই ভালোবাসা কোনোদিন পূর্ণ হবে না, চন্দনা। তোমার বাবা..."

চন্দনা হাত ধরে বলল,

— "আমি বাবার কাছে কিছু চাইনি কোনোদিন। শুধু একবার চাইব, তোমাকে।"

কিন্তু প্রেম সহজ নয়। একদিন হরিপদ রায় জানতে পারলেন এই সম্পর্কের কথা। অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন তিনি। অরুণকে হুমকি দিলেন,

— "আমার মেয়ের দিকে আর কখনো তাকাবি না!"

অরুণ ভয়ে পিছিয়ে এল, কিন্তু চন্দনা পিছু হটেনি।

— "আমি অরুণকেই ভালোবাসি।"

বাবা রেগে চন্দনাকে গৃহবন্দী করলেন। কিন্তু ভালোবাসাকে কি আটকে রাখা যায়? চন্দনা রাতে জানালা দিয়ে চুপিচুপি বেরিয়ে অরুণের সঙ্গে দেখা করত।

একদিন হঠাৎ অরুণ নিখোঁজ হয়ে গেল। কেউ খুঁজে পেল না তাকে। চন্দনা জানত, এটা তার বাবার কাজ। সে বাবার মুখোমুখি দাঁড়াল।

— "তুমি অরুণকে কোথায় নিয়ে গেছো?"

হরিপদ রায় কঠোর গলায় বললেন,

— "ওর মতো ছেলের সাহস হয় কী করে, আমার মেয়েকে ভালোবাসার? আমি ওকে দূরে পাঠিয়ে দিয়েছি। ও আর ফিরবে না।"

কিন্তু চন্দনা হাল ছাড়েনি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানতে পারল, বাবার লোকেরা অরুণকে এক নির্জন গুদামে আটকে রেখেছে। সে রাতের আঁধারে গিয়ে গোপনে তাকে মুক্ত করল।

অরুণ চোখে জল নিয়ে বলল,

— "তুমি আমার জন্য এত কিছু করলে?"

চন্দনা শক্ত কণ্ঠে বলল,

— "তুমি আমাকে ভালোবাসো, তাই না?"

— "হ্যাঁ!"

— "তাহলে প্রতিশ্রুতি দাও, তুমি সফল হয়ে ফিরে আসবে। আমার বাবা তখন তোমাকে নিজের হাতে আমার হাতে তুলে দেবেন। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব।"

অরুণ প্রতিশ্রুতি দিল। তারপর রাতের আঁধারে সে গ্রাম ছেড়ে চলে গেল, ভালোবাসার প্রতীক্ষা রেখে।

চন্দনা অপেক্ষা করল। এক বছর, দুই বছর, পাঁচ বছর।

অরুণ শহরে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করল, পড়াশোনা করল, নিজের যোগ্যতায় বড় ব্যবসায়ী হয়ে উঠল। কিন্তু তার হৃদয়জুড়ে শুধু একটাই নাম—চন্দনা।

একদিন সে ফিরে এল শ্যামপুরে। বুকের ভেতর উত্তেজনা, চোখে স্বপ্ন। চন্দনার জন্য সে কতদিন অপেক্ষা করেছে!

কিন্তু গ্রামে এসে যা শুনল, তাতে তার পা যেন থমকে গেল।

চন্দনা আর নেই।

একদিন গ্রামের বড়লোকের ছেলের সঙ্গে জোর করে তার বিয়ে ঠিক করেছিল হরিপদ রায়। চন্দনা বাঁচতে চেয়েছিল, প্রতীক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু সে বন্দী হয়ে পড়েছিল নিয়তির ফাঁদে। বিয়ের আগের রাতে সে নিজেই নিজের জীবন শেষ করে দিল, অরুণের ভালোবাসার সঙ্গে প্রতারণা না করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে।

অরুণ শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল, সব কিছু যেন থেমে গেছে। সে চন্দনার বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাতাসে এখনো তার ভালোবাসার গন্ধ ভাসছে।

তারপর ধীরে ধীরে নদীর ধারে গেল, যেখানে একসময় তারা স্বপ্ন দেখত। নদীর জলে চন্দনার প্রতিচ্ছবি যেন ভেসে উঠল।

— "তুমি তো বলেছিলে, অপেক্ষা করবে..."

নিঃশব্দ বাতাসে অরুণের কণ্ঠ মিলিয়ে গেল। সে শুধু নদীর জলে একটা ছোট্ট কাগজের নৌকা ভাসিয়ে দিল। নৌকাটার গায়ে লেখা ছিল—

"চন্দনা, আমি ফিরে এসেছি..."

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দুপুরের ভালবাসা

  অফিসের ব্যস্ত পরিবেশের মধ্যেও দীপকের দিকে তাকালে হৃদয়ের গভীরে এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করত সায়নার। কয়েক সপ্তাহ হলো তাদের বন্ধুত্ব একটু ভিন্ন মোড় নিয়েছে, কিন্তু সায়না জানে—এই সম্পর্ক তার জীবনকে বদলে দেবে চিরদিনের জন্য। সবকিছু শুরু হয়েছিল এক দুপুরের বিরতিতে। দীপক সায়নাকে বলল, "চলো, ব্যাংকে যেতে হবে, তুমি সঙ্গ দেবে?" সায়না কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেল। দীপকের গাড়িতে উঠতেই সে অনুভব করল এক অদ্ভুত উত্তেজনা, এক মিষ্টি টান। অফিসে ব্যস্ততার কারণে সারাদিন ওদের মধ্যে খুব কম কথাই হয়, তাই দীপকের সঙ্গে একান্তে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে ওর মন আনন্দে নেচে উঠল। ড্রাইভের সময় দীপকের দৃঢ় হাতে স্টিয়ারিং চাকা ধরার ভঙ্গিটা সায়নার মনে একরকম শিহরণ জাগাল। ওর মনের মাঝে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করছিল। গাড়িতে বসে সে দীপকের দিকেই তাকিয়ে রইল। দীপক ব্যাংকে কাজ সেরে যখন ফিরে এল, তখন ওর হেঁটে আসার দৃশ্য দেখে সায়নার বুকের ভিতর ধকধক করতে লাগল। দীপকের সুগঠিত শরীর, চোখের সেই গভীরতা—সব মিলিয়ে ও যেন এক মোহময় মানুষ। গাড়িতে উঠে দীপক একঝলক তাকিয়েই বুঝতে পারল সায়নার মনের অবস্থা। — "কী হলো? চুপ করে আছো কেন?...

অন্তহীন তৃষ্ণা: হৃদয়ের এক অবাধ্য উপাখ্যান

সূচনা: বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা ঢাকা শহরের ধুলোবালি আর ব্যস্ততার মাঝেও কিছু মুহূর্ত আসে যা জীবনকে আমূল বদলে দেয়। নীলার জীবনে হেনরি (সায়েম) ছিল সেই কালবৈশাখী ঝড়ের মতো—অপ্রত্যাশিত কিন্তু অনিবার্য। তাদের পরিচয়ের পর থেকে গত তিন মাসে নীলা এক অন্য জগতে বাস করছে। সায়েমকে দেখার পর থেকে তার ভেতরে এমন এক সুপ্ত কামনার জন্ম হয়েছে, যা সে আগে কখনও অনুভব করেনি। গত সাত মাস কোনো পুরুষের ছোঁয়া না পাওয়া শরীরটা যেন কেবল সায়েমের অপেক্ষাতেই ছিল। নীলা জানত না সায়েমের মধ্যে কী এমন জাদুকরী শক্তি আছে, কিন্তু তার গভীর চোখের চাউনি আর গম্ভীর কণ্ঠস্বর নীলার দীর্ঘদিনের সাজানো ‘সংকল্প’ বা 'রেজোলিউশন' ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। প্রথম রাতের সেই উন্মাদনা সেদিন ছিল এক মেঘলা রাত। নীলার ড্রয়িংরুমে বসে তারা কফি খাচ্ছিল। নীলার মনে কোনো অভিসন্ধি ছিল না; সে কেবল সায়েমের সান্নিধ্য চেয়েছিল। কিন্তু সায়েম যখন কাছে এসে নীলার কপালে আলতো করে চুমু খেল এবং খুব ধীর স্বরে কথা বলতে শুরু করল, নীলা যেন সম্মোহিত হয়ে গেল। সায়েমের পুরুষালি সুবাসে নীলা মাতাল হয়ে যাচ্ছিল। নীলা নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু সায়েমের হাতের ছোঁয়া যখন তার ...

रंग, प्रेम और कला: एक अधूरी दास्तान | Hindi Romantic Story for Artists

कला एक ऐसी भाषा है जिसकी कोई सीमा नहीं होती। यह भावनाओं को, छुअन को और रंगों को एक ऐसे कैनवास पर उकेरती है जो शब्दों से परे होता है। भारत जैसे देश में, जहाँ कला और संस्कृति की जड़ें बहुत गहरी हैं, प्रेम को अक्सर एक आध्यात्मिक और दिव्य रूप में देखा गया है। लेकिन कभी-कभी, दो अलग-अलग पीढ़ियों, दो अलग-अलग दृष्टिकोणों के बीच का प्रेम भी रंगों की तरह आपस में घुल-मिल जाता है। यह कहानी है एक ऐसे चित्रकार की, जिसकी उम्र के इस पड़ाव पर कला ही उसका सब कुछ थी, और एक ऐसी युवा लड़की की जो रंगों की दुनिया में अपनी पहचान बनाना चाहती थी। पहला अध्याय: कला की दुनिया और मुलाकात मैं लगभग पैंतीस साल का हूँ और बारह साल की उम्र से कला और रंगों की दुनिया में डूबा हुआ हूँ। मेरी आँखों ने रंगों के अनगिनत शेड्स देखे हैं, लेकिन जब आप एक ऐसे शहर में रहते हैं जहाँ युवा और ऊर्जावान छात्र-छात्राएं कला सीखने आते हैं, तो जीवन का नजरिया थोड़ा बदल जाता है। यहाँ एक प्रसिद्ध कला महाविद्यालय है, जहाँ के छात्रों के पास अभी सीखने के लिए बहुत कुछ है। लेकिन हर नए सेमेस्टर के साथ, जीवन में कुछ नई ऊर्जा, कुछ नए रंग और कुछ ताज़गी जर...