১
গ্রামের নাম ছিল শ্যামপুর। সবুজ ধানখেত, সরু কাঁচা রাস্তা আর সন্ধ্যায় মিটিমিটি জ্বলতে থাকা প্রদীপের আলোয় গাঁথা এক চিরচেনা গ্রাম। এই গ্রামেই বাস করত অরুণ। অরুণের বাবা ছিলেন একজন কৃষক, অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু অভাব কখনো তার মনোবল ভাঙতে পারেনি। পড়াশোনার প্রতি তার ছিল অসম্ভব টান। দিনভর মাঠে বাবার সঙ্গে কাজ করত, আর রাতে কুপি জ্বালিয়ে বই নিয়ে বসত।
অরুণের কঠোর পরিশ্রম আর ভালোবাসা তার চোখে স্বপ্ন এঁকে দিয়েছিল—সে একদিন বড় কিছু হবে। কিন্তু সে স্বপ্নেও ভাবেনি, তার জীবনে এক আশ্চর্য প্রেম এসে পড়বে, যা তার জীবন বদলে দেবে।
২
অরুণের প্রেম এলো অপ্রত্যাশিতভাবে। গ্রামের প্রধান হরিপদ রায়ের একমাত্র মেয়ে, চন্দনা। ধনীর দুলালী, একরোখা স্বভাবের মেয়ে, কিন্তু মনটা ছিল সোনার মতো। সে ছিল গ্রামের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে, চোখের তারায় ঝিলমিল আলো।
চন্দনার অরুণকে প্রথম দেখা হয়েছিল এক বিকেলে, যখন সে মাঠের ধারে বসে বই পড়ছিল। তখন বাতাসে ধানের গন্ধ, আর সূর্য তখনও আধভেজা কমলারঙা। চন্দনা হেসে বলেছিল,
— "তুমি এত পড়ো কেন?"
অরুণ চমকে উঠে বলেছিল,
— "স্বপ্ন দেখতে ভালো লাগে।"
চন্দনা তখনো বুঝতে পারেনি, এই ছেলেটাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠবে।
৩
প্রতিদিন দেখা হতে লাগল। কখনো নদীর ধারে, কখনো গ্রামের মেলায়, কখনোবা স্কুলের পথে। চন্দনা প্রথম অনুভব করল, তার হৃদয়টা যেন অরুণের জন্য ধুকপুক করছে। সে প্রথম প্রেমে পড়ল।
কিন্তু অরুণ? সে জানত, তারা দুই ভিন্ন জগৎর মানুষ। হরিপদ রায় কখনোই মেনে নেবেন না তার মেয়ের সঙ্গে একজন গরিব কৃষকের ছেলের সম্পর্ক। তাই অরুণ নিজেকে সরিয়ে রাখতে চাইল।
কিন্তু চন্দনা হাল ছাড়ার মেয়ে নয়। একদিন সে অরুণকে বলল,
— "তুমি আমায় ভালোবাসো, তাই না?"
অরুণ চুপ।
— "সত্যি করে বলো!"
অরুণ আস্তে করে বলল,
— "ভালোবাসি। কিন্তু আমাদের এই ভালোবাসা কোনোদিন পূর্ণ হবে না, চন্দনা। তোমার বাবা..."
চন্দনা হাত ধরে বলল,
— "আমি বাবার কাছে কিছু চাইনি কোনোদিন। শুধু একবার চাইব, তোমাকে।"
৪
কিন্তু প্রেম সহজ নয়। একদিন হরিপদ রায় জানতে পারলেন এই সম্পর্কের কথা। অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন তিনি। অরুণকে হুমকি দিলেন,
— "আমার মেয়ের দিকে আর কখনো তাকাবি না!"
অরুণ ভয়ে পিছিয়ে এল, কিন্তু চন্দনা পিছু হটেনি।
— "আমি অরুণকেই ভালোবাসি।"
বাবা রেগে চন্দনাকে গৃহবন্দী করলেন। কিন্তু ভালোবাসাকে কি আটকে রাখা যায়? চন্দনা রাতে জানালা দিয়ে চুপিচুপি বেরিয়ে অরুণের সঙ্গে দেখা করত।
৫
একদিন হঠাৎ অরুণ নিখোঁজ হয়ে গেল। কেউ খুঁজে পেল না তাকে। চন্দনা জানত, এটা তার বাবার কাজ। সে বাবার মুখোমুখি দাঁড়াল।
— "তুমি অরুণকে কোথায় নিয়ে গেছো?"
হরিপদ রায় কঠোর গলায় বললেন,
— "ওর মতো ছেলের সাহস হয় কী করে, আমার মেয়েকে ভালোবাসার? আমি ওকে দূরে পাঠিয়ে দিয়েছি। ও আর ফিরবে না।"
কিন্তু চন্দনা হাল ছাড়েনি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানতে পারল, বাবার লোকেরা অরুণকে এক নির্জন গুদামে আটকে রেখেছে। সে রাতের আঁধারে গিয়ে গোপনে তাকে মুক্ত করল।
অরুণ চোখে জল নিয়ে বলল,
— "তুমি আমার জন্য এত কিছু করলে?"
চন্দনা শক্ত কণ্ঠে বলল,
— "তুমি আমাকে ভালোবাসো, তাই না?"
— "হ্যাঁ!"
— "তাহলে প্রতিশ্রুতি দাও, তুমি সফল হয়ে ফিরে আসবে। আমার বাবা তখন তোমাকে নিজের হাতে আমার হাতে তুলে দেবেন। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব।"
অরুণ প্রতিশ্রুতি দিল। তারপর রাতের আঁধারে সে গ্রাম ছেড়ে চলে গেল, ভালোবাসার প্রতীক্ষা রেখে।
৬
চন্দনা অপেক্ষা করল। এক বছর, দুই বছর, পাঁচ বছর।
অরুণ শহরে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করল, পড়াশোনা করল, নিজের যোগ্যতায় বড় ব্যবসায়ী হয়ে উঠল। কিন্তু তার হৃদয়জুড়ে শুধু একটাই নাম—চন্দনা।
একদিন সে ফিরে এল শ্যামপুরে। বুকের ভেতর উত্তেজনা, চোখে স্বপ্ন। চন্দনার জন্য সে কতদিন অপেক্ষা করেছে!
কিন্তু গ্রামে এসে যা শুনল, তাতে তার পা যেন থমকে গেল।
চন্দনা আর নেই।
একদিন গ্রামের বড়লোকের ছেলের সঙ্গে জোর করে তার বিয়ে ঠিক করেছিল হরিপদ রায়। চন্দনা বাঁচতে চেয়েছিল, প্রতীক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু সে বন্দী হয়ে পড়েছিল নিয়তির ফাঁদে। বিয়ের আগের রাতে সে নিজেই নিজের জীবন শেষ করে দিল, অরুণের ভালোবাসার সঙ্গে প্রতারণা না করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে।
অরুণ শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল, সব কিছু যেন থেমে গেছে। সে চন্দনার বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাতাসে এখনো তার ভালোবাসার গন্ধ ভাসছে।
তারপর ধীরে ধীরে নদীর ধারে গেল, যেখানে একসময় তারা স্বপ্ন দেখত। নদীর জলে চন্দনার প্রতিচ্ছবি যেন ভেসে উঠল।
— "তুমি তো বলেছিলে, অপেক্ষা করবে..."
নিঃশব্দ বাতাসে অরুণের কণ্ঠ মিলিয়ে গেল। সে শুধু নদীর জলে একটা ছোট্ট কাগজের নৌকা ভাসিয়ে দিল। নৌকাটার গায়ে লেখা ছিল—
"চন্দনা, আমি ফিরে এসেছি..."
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন