সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ভাগ্যের পূর্বাভাস

download-26

গ্রীষ্মের এক সন্ধ্যায়, কলকাতার এক বড় কার্নিভালে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছিল তৃষা। কলেজের শেষ বর্ষে পড়া তরুণী তৃষা বরাবরই কৌতূহলী মনের মেয়ে, কিন্তু আজকের সন্ধ্যায় তার মন একটু বিক্ষিপ্ত ছিল। কয়েক মাস আগে তার দীর্ঘদিনের প্রেমিক ভেঙ্কটেশ সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল। সেই ব্যথা এখনও তার মনে দগদগে হয়ে আছে।

তার বন্ধু, পারমিতা, হঠাৎ করেই একটি ছোট্ট তাঁবুর দিকে ইশারা করে বলল, "তৃষা! এখানে দেখ, একটা ভবিষ্যৎবক্তা বসেছে! চল, একবার ঢুকে দেখা যাক!"

তৃষা একটু দ্বিধাগ্রস্ত হলো। এসব ভবিষ্যদ্বাণী, ভাগ্যের কথা – সবই তার কাছে অর্থহীন ঠেকত। কিন্তু পারমিতা তাকে খোঁচা দিয়ে বলল, "তুই তো বলিস সবকিছু খোলা মনে দেখতে হয়। তাহলে এটা কেন নয়?"

পারমিতার কথার মধ্যে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল, যা তৃষার আত্মসম্মানবোধকে উস্কে দিল। শেষ পর্যন্ত সে রাজি হলো।

তাঁবুর ভেতরে ঢুকতেই ঘন ধোঁয়ায় মোড়া রহস্যময় পরিবেশ তাকে চমকে দিল। একটি জীর্ণ, বয়স্ক মহিলা চেয়ারে বসে ছিল। তার কন্ঠস্বর ছিল কর্কশ, চোখ দুটো গভীর আর জ্ঞানগম্যির ছাপ মাখা।

তিনি প্রথমেই বললেন, "আমি বুঝতে পারছি, এখন সময়টা তোমার জন্য কঠিন। কিন্তু তোমার কাছে সত্য গোপন করব না। সে আর ফিরবে না।"

তৃষা হতভম্ব হয়ে গেল। ভবিষ্যৎবক্তা সরাসরি ভেঙ্কটেশের কথা বলছে? তার হৃদয় দ্রুত লাফিয়ে উঠল।

মহিলা আবার বললেন, "তুমি একসময় চেয়েছিলে দু’জন হতে, কিন্তু তিনজন হয়েছিলে। এটা দু’বার আরও ঘটবে। তিনবার, তুমি তিনজনের মধ্যে একজন হবে।"

তৃষা পুরোপুরি হতচকিত হয়ে গেল। এর অর্থ কী? সে এই ভবিষ্যদ্বাণীকে তেমন গুরুত্ব না দিয়েই তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলো, কিন্তু মনের মধ্যে একটা অজানা অস্বস্তি থেকে গেল।

প্রথম সত্য হওয়া ভবিষ্যদ্বাণী

কয়েক বছর পর, তৃষা বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে চাকরির জগতে প্রবেশ করল। বেশ কয়েকটি সম্পর্ক এল এবং গেল, কিন্তু স্থায়ী কিছুই হলো না। অবশেষে, সে জয়ন্তের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ল। জয়ন্ত এক সফল ফাইনান্স এক্সিকিউটিভ, তার ব্যবহার মার্জিত এবং পরিপাটি।

তাদের সম্পর্ক সহজ, নির্বিঘ্ন, কিন্তু কখনও গভীর উত্তেজনার সৃষ্টি হয়নি। তৃষা অনেক সময় ভেবেছে, এটি কি সত্যিকারের ভালোবাসা, নাকি শুধুই মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা?

এক সন্ধ্যায়, জয়ন্তর অ্যাপার্টমেন্টে দু’জন একান্তে সময় কাটাচ্ছিল। হঠাৎ করেই দরজার চাবি ঘোরার শব্দ হলো।

একটি নারীকণ্ঠ আনন্দের সঙ্গে বলল, "সারপ্রাইজ!"

তৃষা বিস্মিত হয়ে গেল, আর পর মুহূর্তেই দেখল এক অপরিচিত নারী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যার হাতে বাড়ির চাবি!

"জয়ন্ত, এটা কে?" তৃষা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।

নারীটি তৃষার দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। তার চোখে ছিল দ্বিধার ছাপ।

জয়ন্ত ইতস্তত করতে লাগল, তারপর ধীরে ধীরে স্বীকার করল যে সে প্রতারণা করেছে।

তৃষার মাথায় ঘুরে উঠল কার্নিভালের সেই রাতে শোনা ভবিষ্যদ্বাণী—"তিনবার, তুমি তিনজনের মধ্যে একজন হবে।" এটা কি প্রথমবার ঘটল?

দ্বিতীয় আঘাত

সময় কেটে গেল, তৃষা আবার নিজের জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু করল। এবার সে বিয়ে করল দেবদীপকে, যে একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং অত্যন্ত সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ।

তাদের দাম্পত্য জীবন মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু একদিন দেবদীপ অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে তার সামনে বসে স্বীকার করল, "তৃষা, আমি জানি এটা বলার কোনো সঠিক উপায় নেই। কিন্তু আমি একবার ভুল করেছিলাম। একটা রাতের ভুল, যার কোনো মানে ছিল না, কিন্তু এটা আমি গোপন রাখতে পারছি না।"

তৃষার বুকটা হিম হয়ে গেল। আবারও কি সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হলো?

কিন্তু এবার সে আগের মতো আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া দিল না। ধৈর্য ধরে দেবদীপের চোখের দিকে তাকাল, বুঝতে চাইল এই সম্পর্ক বাঁচানোর মতো কি কিছু বাকি আছে।

তৃতীয় আঘাত ও আত্মউপলব্ধি

শেষ পর্যন্ত, তৃষা আবার প্রেমে পড়ল—এবার মিহিরের সঙ্গে। মিহির ছিল তার কর্মস্থলের এক সহকর্মী, বন্ধুত্ব থেকেই ধীরে ধীরে ভালোবাসা জন্ম নেয়।

সবকিছু সুন্দরভাবেই চলছিল, কিন্তু একদিন হঠাৎ মিহিরের ফোনে একটি বার্তা দেখতে পেল তৃষা—"আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না, প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না!"

তৃষার হৃদয় এক মুহূর্তে থেমে গেল।

সে সরাসরি মিহিরের মুখোমুখি হলো।

"এটা কে?" তার গলায় শঙ্কা ও হতাশা স্পষ্ট ছিল।

মিহির কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তারপর স্বীকার করল যে তার অন্য এক মহিলার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

তৃষার চোখের সামনে আবার সেই ভবিষ্যদ্বাণীর শব্দগুলো ভেসে উঠল। তিনবার, সে "তিনজনের একজন" হয়েছে।

কিন্তু এবার সে ভেঙে পড়ল না।

সে বুঝতে পারল, জীবন আসলে ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর নির্ভর করে না। বরং, সে নিজেই এমন কিছু বেছে নিয়েছিল যা তাকে বারবার এই পরিস্থিতিতে ফেলেছে।

তৃষা এবার নিজের শক্তি খুঁজে পেল। সে বুঝল, কারও ছায়ায় নিজেকে হারিয়ে ফেলাই তার আসল ভুল ছিল।

উপসংহার

তৃষা বুঝতে পারল, ভাগ্য হয়তো আমাদের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রাখে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা কীভাবে বাঁচব, সেটা আমাদের নিজেদের উপর নির্ভর করে।

সে নিজের মতো করে বাঁচার সিদ্ধান্ত নিল।

ভবিষ্যৎবক্তার ভবিষ্যদ্বাণী হয়তো একসময় সত্যি মনে হয়েছিল, কিন্তু এখন তৃষা বুঝতে পারল যে সেটি শুধু তার মনকেই পরিচালিত করেছিল, জীবনকে নয়।

এবার সে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই লিখবে।

এই গল্পটি প্রেম, বিশ্বাসভঙ্গ, এবং আত্ম-উপলব্ধির এক গভীর চিত্র তুলে ধরে। তৃষার জার্নি আমাদের শেখায় যে সত্যিকারের সুখ বাইরের ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর নয়, বরং আমাদের নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দুপুরের ভালবাসা

  অফিসের ব্যস্ত পরিবেশের মধ্যেও দীপকের দিকে তাকালে হৃদয়ের গভীরে এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করত সায়নার। কয়েক সপ্তাহ হলো তাদের বন্ধুত্ব একটু ভিন্ন মোড় নিয়েছে, কিন্তু সায়না জানে—এই সম্পর্ক তার জীবনকে বদলে দেবে চিরদিনের জন্য। সবকিছু শুরু হয়েছিল এক দুপুরের বিরতিতে। দীপক সায়নাকে বলল, "চলো, ব্যাংকে যেতে হবে, তুমি সঙ্গ দেবে?" সায়না কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেল। দীপকের গাড়িতে উঠতেই সে অনুভব করল এক অদ্ভুত উত্তেজনা, এক মিষ্টি টান। অফিসে ব্যস্ততার কারণে সারাদিন ওদের মধ্যে খুব কম কথাই হয়, তাই দীপকের সঙ্গে একান্তে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে ওর মন আনন্দে নেচে উঠল। ড্রাইভের সময় দীপকের দৃঢ় হাতে স্টিয়ারিং চাকা ধরার ভঙ্গিটা সায়নার মনে একরকম শিহরণ জাগাল। ওর মনের মাঝে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করছিল। গাড়িতে বসে সে দীপকের দিকেই তাকিয়ে রইল। দীপক ব্যাংকে কাজ সেরে যখন ফিরে এল, তখন ওর হেঁটে আসার দৃশ্য দেখে সায়নার বুকের ভিতর ধকধক করতে লাগল। দীপকের সুগঠিত শরীর, চোখের সেই গভীরতা—সব মিলিয়ে ও যেন এক মোহময় মানুষ। গাড়িতে উঠে দীপক একঝলক তাকিয়েই বুঝতে পারল সায়নার মনের অবস্থা। — "কী হলো? চুপ করে আছো কেন?...

অন্তহীন তৃষ্ণা: হৃদয়ের এক অবাধ্য উপাখ্যান

সূচনা: বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা ঢাকা শহরের ধুলোবালি আর ব্যস্ততার মাঝেও কিছু মুহূর্ত আসে যা জীবনকে আমূল বদলে দেয়। নীলার জীবনে হেনরি (সায়েম) ছিল সেই কালবৈশাখী ঝড়ের মতো—অপ্রত্যাশিত কিন্তু অনিবার্য। তাদের পরিচয়ের পর থেকে গত তিন মাসে নীলা এক অন্য জগতে বাস করছে। সায়েমকে দেখার পর থেকে তার ভেতরে এমন এক সুপ্ত কামনার জন্ম হয়েছে, যা সে আগে কখনও অনুভব করেনি। গত সাত মাস কোনো পুরুষের ছোঁয়া না পাওয়া শরীরটা যেন কেবল সায়েমের অপেক্ষাতেই ছিল। নীলা জানত না সায়েমের মধ্যে কী এমন জাদুকরী শক্তি আছে, কিন্তু তার গভীর চোখের চাউনি আর গম্ভীর কণ্ঠস্বর নীলার দীর্ঘদিনের সাজানো ‘সংকল্প’ বা 'রেজোলিউশন' ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। প্রথম রাতের সেই উন্মাদনা সেদিন ছিল এক মেঘলা রাত। নীলার ড্রয়িংরুমে বসে তারা কফি খাচ্ছিল। নীলার মনে কোনো অভিসন্ধি ছিল না; সে কেবল সায়েমের সান্নিধ্য চেয়েছিল। কিন্তু সায়েম যখন কাছে এসে নীলার কপালে আলতো করে চুমু খেল এবং খুব ধীর স্বরে কথা বলতে শুরু করল, নীলা যেন সম্মোহিত হয়ে গেল। সায়েমের পুরুষালি সুবাসে নীলা মাতাল হয়ে যাচ্ছিল। নীলা নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু সায়েমের হাতের ছোঁয়া যখন তার ...

रंग, प्रेम और कला: एक अधूरी दास्तान | Hindi Romantic Story for Artists

कला एक ऐसी भाषा है जिसकी कोई सीमा नहीं होती। यह भावनाओं को, छुअन को और रंगों को एक ऐसे कैनवास पर उकेरती है जो शब्दों से परे होता है। भारत जैसे देश में, जहाँ कला और संस्कृति की जड़ें बहुत गहरी हैं, प्रेम को अक्सर एक आध्यात्मिक और दिव्य रूप में देखा गया है। लेकिन कभी-कभी, दो अलग-अलग पीढ़ियों, दो अलग-अलग दृष्टिकोणों के बीच का प्रेम भी रंगों की तरह आपस में घुल-मिल जाता है। यह कहानी है एक ऐसे चित्रकार की, जिसकी उम्र के इस पड़ाव पर कला ही उसका सब कुछ थी, और एक ऐसी युवा लड़की की जो रंगों की दुनिया में अपनी पहचान बनाना चाहती थी। पहला अध्याय: कला की दुनिया और मुलाकात मैं लगभग पैंतीस साल का हूँ और बारह साल की उम्र से कला और रंगों की दुनिया में डूबा हुआ हूँ। मेरी आँखों ने रंगों के अनगिनत शेड्स देखे हैं, लेकिन जब आप एक ऐसे शहर में रहते हैं जहाँ युवा और ऊर्जावान छात्र-छात्राएं कला सीखने आते हैं, तो जीवन का नजरिया थोड़ा बदल जाता है। यहाँ एक प्रसिद्ध कला महाविद्यालय है, जहाँ के छात्रों के पास अभी सीखने के लिए बहुत कुछ है। लेकिन हर नए सेमेस्टर के साथ, जीवन में कुछ नई ऊर्जा, कुछ नए रंग और कुछ ताज़गी जर...