
গ্রীষ্মের এক সন্ধ্যায়, কলকাতার এক বড় কার্নিভালে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছিল তৃষা। কলেজের শেষ বর্ষে পড়া তরুণী তৃষা বরাবরই কৌতূহলী মনের মেয়ে, কিন্তু আজকের সন্ধ্যায় তার মন একটু বিক্ষিপ্ত ছিল। কয়েক মাস আগে তার দীর্ঘদিনের প্রেমিক ভেঙ্কটেশ সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গিয়েছিল। সেই ব্যথা এখনও তার মনে দগদগে হয়ে আছে।
তার বন্ধু, পারমিতা, হঠাৎ করেই একটি ছোট্ট তাঁবুর দিকে ইশারা করে বলল, "তৃষা! এখানে দেখ, একটা ভবিষ্যৎবক্তা বসেছে! চল, একবার ঢুকে দেখা যাক!"
তৃষা একটু দ্বিধাগ্রস্ত হলো। এসব ভবিষ্যদ্বাণী, ভাগ্যের কথা – সবই তার কাছে অর্থহীন ঠেকত। কিন্তু পারমিতা তাকে খোঁচা দিয়ে বলল, "তুই তো বলিস সবকিছু খোলা মনে দেখতে হয়। তাহলে এটা কেন নয়?"
পারমিতার কথার মধ্যে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল, যা তৃষার আত্মসম্মানবোধকে উস্কে দিল। শেষ পর্যন্ত সে রাজি হলো।
তাঁবুর ভেতরে ঢুকতেই ঘন ধোঁয়ায় মোড়া রহস্যময় পরিবেশ তাকে চমকে দিল। একটি জীর্ণ, বয়স্ক মহিলা চেয়ারে বসে ছিল। তার কন্ঠস্বর ছিল কর্কশ, চোখ দুটো গভীর আর জ্ঞানগম্যির ছাপ মাখা।
তিনি প্রথমেই বললেন, "আমি বুঝতে পারছি, এখন সময়টা তোমার জন্য কঠিন। কিন্তু তোমার কাছে সত্য গোপন করব না। সে আর ফিরবে না।"
তৃষা হতভম্ব হয়ে গেল। ভবিষ্যৎবক্তা সরাসরি ভেঙ্কটেশের কথা বলছে? তার হৃদয় দ্রুত লাফিয়ে উঠল।
মহিলা আবার বললেন, "তুমি একসময় চেয়েছিলে দু’জন হতে, কিন্তু তিনজন হয়েছিলে। এটা দু’বার আরও ঘটবে। তিনবার, তুমি তিনজনের মধ্যে একজন হবে।"
তৃষা পুরোপুরি হতচকিত হয়ে গেল। এর অর্থ কী? সে এই ভবিষ্যদ্বাণীকে তেমন গুরুত্ব না দিয়েই তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলো, কিন্তু মনের মধ্যে একটা অজানা অস্বস্তি থেকে গেল।
প্রথম সত্য হওয়া ভবিষ্যদ্বাণী
কয়েক বছর পর, তৃষা বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে চাকরির জগতে প্রবেশ করল। বেশ কয়েকটি সম্পর্ক এল এবং গেল, কিন্তু স্থায়ী কিছুই হলো না। অবশেষে, সে জয়ন্তের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ল। জয়ন্ত এক সফল ফাইনান্স এক্সিকিউটিভ, তার ব্যবহার মার্জিত এবং পরিপাটি।
তাদের সম্পর্ক সহজ, নির্বিঘ্ন, কিন্তু কখনও গভীর উত্তেজনার সৃষ্টি হয়নি। তৃষা অনেক সময় ভেবেছে, এটি কি সত্যিকারের ভালোবাসা, নাকি শুধুই মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা?
এক সন্ধ্যায়, জয়ন্তর অ্যাপার্টমেন্টে দু’জন একান্তে সময় কাটাচ্ছিল। হঠাৎ করেই দরজার চাবি ঘোরার শব্দ হলো।
একটি নারীকণ্ঠ আনন্দের সঙ্গে বলল, "সারপ্রাইজ!"
তৃষা বিস্মিত হয়ে গেল, আর পর মুহূর্তেই দেখল এক অপরিচিত নারী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যার হাতে বাড়ির চাবি!
"জয়ন্ত, এটা কে?" তৃষা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
নারীটি তৃষার দিকে তাকিয়ে থমকে গেল। তার চোখে ছিল দ্বিধার ছাপ।
জয়ন্ত ইতস্তত করতে লাগল, তারপর ধীরে ধীরে স্বীকার করল যে সে প্রতারণা করেছে।
তৃষার মাথায় ঘুরে উঠল কার্নিভালের সেই রাতে শোনা ভবিষ্যদ্বাণী—"তিনবার, তুমি তিনজনের মধ্যে একজন হবে।" এটা কি প্রথমবার ঘটল?
দ্বিতীয় আঘাত
সময় কেটে গেল, তৃষা আবার নিজের জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু করল। এবার সে বিয়ে করল দেবদীপকে, যে একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং অত্যন্ত সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ।
তাদের দাম্পত্য জীবন মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু একদিন দেবদীপ অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে তার সামনে বসে স্বীকার করল, "তৃষা, আমি জানি এটা বলার কোনো সঠিক উপায় নেই। কিন্তু আমি একবার ভুল করেছিলাম। একটা রাতের ভুল, যার কোনো মানে ছিল না, কিন্তু এটা আমি গোপন রাখতে পারছি না।"
তৃষার বুকটা হিম হয়ে গেল। আবারও কি সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হলো?
কিন্তু এবার সে আগের মতো আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া দিল না। ধৈর্য ধরে দেবদীপের চোখের দিকে তাকাল, বুঝতে চাইল এই সম্পর্ক বাঁচানোর মতো কি কিছু বাকি আছে।
তৃতীয় আঘাত ও আত্মউপলব্ধি
শেষ পর্যন্ত, তৃষা আবার প্রেমে পড়ল—এবার মিহিরের সঙ্গে। মিহির ছিল তার কর্মস্থলের এক সহকর্মী, বন্ধুত্ব থেকেই ধীরে ধীরে ভালোবাসা জন্ম নেয়।
সবকিছু সুন্দরভাবেই চলছিল, কিন্তু একদিন হঠাৎ মিহিরের ফোনে একটি বার্তা দেখতে পেল তৃষা—"আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না, প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না!"
তৃষার হৃদয় এক মুহূর্তে থেমে গেল।
সে সরাসরি মিহিরের মুখোমুখি হলো।
"এটা কে?" তার গলায় শঙ্কা ও হতাশা স্পষ্ট ছিল।
মিহির কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, তারপর স্বীকার করল যে তার অন্য এক মহিলার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
তৃষার চোখের সামনে আবার সেই ভবিষ্যদ্বাণীর শব্দগুলো ভেসে উঠল। তিনবার, সে "তিনজনের একজন" হয়েছে।
কিন্তু এবার সে ভেঙে পড়ল না।
সে বুঝতে পারল, জীবন আসলে ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর নির্ভর করে না। বরং, সে নিজেই এমন কিছু বেছে নিয়েছিল যা তাকে বারবার এই পরিস্থিতিতে ফেলেছে।
তৃষা এবার নিজের শক্তি খুঁজে পেল। সে বুঝল, কারও ছায়ায় নিজেকে হারিয়ে ফেলাই তার আসল ভুল ছিল।
উপসংহার
তৃষা বুঝতে পারল, ভাগ্য হয়তো আমাদের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রাখে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা কীভাবে বাঁচব, সেটা আমাদের নিজেদের উপর নির্ভর করে।
সে নিজের মতো করে বাঁচার সিদ্ধান্ত নিল।
ভবিষ্যৎবক্তার ভবিষ্যদ্বাণী হয়তো একসময় সত্যি মনে হয়েছিল, কিন্তু এখন তৃষা বুঝতে পারল যে সেটি শুধু তার মনকেই পরিচালিত করেছিল, জীবনকে নয়।
এবার সে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই লিখবে।
এই গল্পটি প্রেম, বিশ্বাসভঙ্গ, এবং আত্ম-উপলব্ধির এক গভীর চিত্র তুলে ধরে। তৃষার জার্নি আমাদের শেখায় যে সত্যিকারের সুখ বাইরের ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর নয়, বরং আমাদের নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন