সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

এক অদ্ভুত ভাগ্যের খেলা

download-28

 

১. প্রথম দেখা

সুমিত রায়, একজন ভারতীয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতন থেকে এসেছেন। কাজের সূত্রে তিনি দার্জিলিংয়ের একটি হোটেলে যোগ দিয়েছেন, যেখানে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে অপূর্ব সৌন্দর্যে ঘেরা এক মনোরম পরিবেশ।

একদিন হোটেলের লবিতে ব্যস্ত থাকাকালীন, সুমিত লক্ষ্য করল এক বিদেশিনী প্রবেশ করল। খাটো, সুদর্শনা, উজ্জ্বল টানা টানা চোখ— যেন স্বপ্ন থেকে উঠে আসা কোনো চরিত্র। তিনি ছিলেন চিং সাং, এক চিনা পর্যটক, যিনি কয়েক দিনের জন্য দার্জিলিং এসেছেন।

চিং বাংলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি আর খাবারের প্রতি দারুণ আগ্রহী ছিলেন। ইংরেজিতে দক্ষ হওয়ায় সুমিত সহজেই চিং র সাথে কথা বলতে পারছিল। প্রথম দিনেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল।

“তুমি কি কখনো চিন গিয়েছ?” চিং জানতে চাইল।

সুমিত হাসল। “না, কিন্তু তোমার গল্প শুনে মনে হচ্ছে যেন গিয়েই ফেলেছি।”

এই কথোপকথনের মাধ্যমেই তাদের সম্পর্কের সূচনা হয়।

২. প্রেমের শুরু

চিং র ছুটি কাটানোর সময় সুমিত তাকে দার্জিলিংয়ের নানা জায়গায় ঘুরিয়ে দেখাল— টাইগার হিল, বাতাসিয়া লুপ, ম্যাল রোড। প্রতিদিনের দেখা, গল্প আর হাসির মাঝে কখন যেন তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল।

এক সন্ধ্যায়, চা-বাগানের মাঝখানে বসে থাকা অবস্থায় চিং হঠাৎ সুমিতের হাত ধরে বলল, “তুমি জানো, আমি যখন ফিরে যাব, তখন তোমাকে খুব মিস করব।”

সুমিত কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে রইল। তারপর আস্তে করে বলল, “আমি-ও। মনে হচ্ছে যেন আমরা অনেক বছর ধরে একে অপরকে চিনি।”

চিং র চোখে কেমন একটা অদ্ভুত ঝলক ফুটে উঠল। “তাহলে আমরা কি দূরত্বকে হার মানতে দেব?”

সেদিনই তারা স্থির করল, দূরত্ব তাদের আলাদা করতে পারবে না। তারা দূরে থেকেও সম্পর্কটা বজায় রাখবে।

৩. দূরত্বের পরীক্ষা

চিং ফিরে গেল চিন, আর সুমিত নিজের কাজে ফিরে গেল। কিন্তু তাদের কথা বলা বন্ধ হলো না। প্রতিদিন রাতের বেলা ভিডিও কলে তারা একে অপরকে খোঁজ নিত, নিজেদের গল্প শেয়ার করত।

কিন্তু এখানেই একটা জটিলতা ছিল—সুমিতের ইতিমধ্যে একজন প্রেমিকা ছিল, ইশিতা। তারা কলেজ জীবন থেকেই একসাথে ছিল, কিন্তু ব্যস্ততার কারণে সম্পর্ক একটু ফিকে হয়ে গিয়েছিল।

একদিন, চিং হঠাৎ জানাল সে আবার ভারতে আসছে, শুধু সুমিতের জন্য। এই সংবাদে সুমিতের আনন্দ যেমন হলো, তেমনই মনের গভীরে একটা অস্বস্তি তৈরি হলো। ইশিতার ব্যাপারটা কীভাবে সামলাবে?

৪. দ্বিধা ও ভালোবাসার টানাপোড়েন

চিং আবার এলো, আর তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো। তারা পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটল, মেঘের ছায়ায় বসে গল্প করল, একে অপরকে নতুনভাবে জানল।

এক সন্ধ্যায়, ম্যাল রোডের একটি ক্যাফেতে বসে চিং হঠাৎ বলল, “সুমিত, আমি চাই আমরা বাকি জীবন একসাথে কাটাই। তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?”

সুমিত কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সে কি সত্যিই এটা করতে পারে? তার তো ইশিতার প্রতি দায়িত্ব আছে।

সে চোখ নামিয়ে বলল, “চিং , আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি, কিন্তু আমার জীবনে একটা জটিলতা আছে।”

চিং র মুখ কালো হয়ে গেল। “তুমি কি কারও সাথে সম্পর্কে আছ?”

সুমিত ধীরে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ, ইশিতা। আমরা ছোটবেলা থেকেই একসাথে, কিন্তু...”

“কিন্তু তুমি আমার প্রেমে পড়েছ, তাই না?”

সুমিত চোখ বন্ধ করল। “হ্যাঁ, পড়েছি। কিন্তু ইশিতার সাথে যা আছে, সেটাও তো মিথ্যা নয়।”

৫. কঠিন সিদ্ধান্ত

কয়েক দিন ধরে চিং খুব চুপচাপ ছিল। সুমিত বুঝতে পারছিল, সে কষ্ট পাচ্ছে।

একদিন, তারা একটা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছিল। চিং ধীরে ধীরে বলল, “তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, তাহলে আমাদের একটা সমাধানে আসতে হবে।”

সুমিত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমি চাই না তোমাকে হারাতে, কিন্তু আমি ইশিতাকেও আঘাত দিতে পারি না।”

চিং কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তাহলে আমাদের হয়তো বন্ধু হয়ে থাকতে হবে।”

সুমিতের বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। “তুমি কি সত্যি এটা পারবে?”

“হয়তো পারব, হয়তো পারব না। কিন্তু এটুকু জানি, আমি চাই না তুমি অপরাধবোধে ভোগো।”

সুমিত কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজে পেল না। শুধু চিং র হাতে নিজের হাতটা রাখল।

৬. নতুন জীবন, পুরোনো স্মৃতি

সময় কেটে গেল। সুমিত ইশিতাকে বিয়ে করল, চিং ও চিন ফিরে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করল।

কিন্তু তারা একে অপরকে ভোলেনি। একদিন, সুমিত ও ইশিতাকে তাদের বিয়েতে আমন্ত্রণ জানিয়ে চিং বলল, “আমি চাই তুমি আমার বিয়েতে থাকো। আমরা যেমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, বন্ধু হয়ে।”

সুমিত কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল, তারপর হাসল। “অবশ্যই যাব।”

বেজিং- এ চিং র বিয়েতে গিয়ে সুমিত দেখল, সে সুখী। তার স্বামী, মার্টিন, একজন দারুণ মানুষ।

বিয়ের পরে চিং এক সন্ধ্যায় সুমিতের পাশে এসে বলল, “তুমি কি জানো, কিছু সম্পর্ক কখনো শেষ হয় না, শুধু তাদের রূপ বদলে যায়।”

সুমিত মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ, এবং আমি জানি আমাদের সম্পর্কটাও তেমনই।”

৭. বিদায়, কিন্তু নয়...

কয়েক বছর পর, সুমিত একটি বড় প্রকল্পে কাজের জন্য আমেরিকায় চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যাওয়ার আগে সে একবার বেজিংএ চিং র সাথে দেখা করল।

চিং হাসতে হাসতে বলল, “তাহলে, তুমি আমেরিকা চলে যাচ্ছ?”

“হ্যাঁ, নতুন জীবন, নতুন অভিজ্ঞতা।”

চিং এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “তুমি জানো, আমরা একে অপরের জীবনে না থেকেও থাকব।”

সুমিত মৃদু হেসে বলল, “হয়তো এটা-ই ভাগ্যের খেলা।”

তারপর তারা বিদায় নিল।

বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে সুমিত পেছন ফিরে দেখল—বেজিংর আলো ঝলমলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিং হাত নাড়ছে।

ভিতরে এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল, কিন্তু সে জানত—কিছু ভালোবাসা দূরত্বেও অমলিন থাকে।

শেষ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দুপুরের ভালবাসা

  অফিসের ব্যস্ত পরিবেশের মধ্যেও দীপকের দিকে তাকালে হৃদয়ের গভীরে এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করত সায়নার। কয়েক সপ্তাহ হলো তাদের বন্ধুত্ব একটু ভিন্ন মোড় নিয়েছে, কিন্তু সায়না জানে—এই সম্পর্ক তার জীবনকে বদলে দেবে চিরদিনের জন্য। সবকিছু শুরু হয়েছিল এক দুপুরের বিরতিতে। দীপক সায়নাকে বলল, "চলো, ব্যাংকে যেতে হবে, তুমি সঙ্গ দেবে?" সায়না কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেল। দীপকের গাড়িতে উঠতেই সে অনুভব করল এক অদ্ভুত উত্তেজনা, এক মিষ্টি টান। অফিসে ব্যস্ততার কারণে সারাদিন ওদের মধ্যে খুব কম কথাই হয়, তাই দীপকের সঙ্গে একান্তে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে ওর মন আনন্দে নেচে উঠল। ড্রাইভের সময় দীপকের দৃঢ় হাতে স্টিয়ারিং চাকা ধরার ভঙ্গিটা সায়নার মনে একরকম শিহরণ জাগাল। ওর মনের মাঝে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করছিল। গাড়িতে বসে সে দীপকের দিকেই তাকিয়ে রইল। দীপক ব্যাংকে কাজ সেরে যখন ফিরে এল, তখন ওর হেঁটে আসার দৃশ্য দেখে সায়নার বুকের ভিতর ধকধক করতে লাগল। দীপকের সুগঠিত শরীর, চোখের সেই গভীরতা—সব মিলিয়ে ও যেন এক মোহময় মানুষ। গাড়িতে উঠে দীপক একঝলক তাকিয়েই বুঝতে পারল সায়নার মনের অবস্থা। — "কী হলো? চুপ করে আছো কেন?...

অন্তহীন তৃষ্ণা: হৃদয়ের এক অবাধ্য উপাখ্যান

সূচনা: বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা ঢাকা শহরের ধুলোবালি আর ব্যস্ততার মাঝেও কিছু মুহূর্ত আসে যা জীবনকে আমূল বদলে দেয়। নীলার জীবনে হেনরি (সায়েম) ছিল সেই কালবৈশাখী ঝড়ের মতো—অপ্রত্যাশিত কিন্তু অনিবার্য। তাদের পরিচয়ের পর থেকে গত তিন মাসে নীলা এক অন্য জগতে বাস করছে। সায়েমকে দেখার পর থেকে তার ভেতরে এমন এক সুপ্ত কামনার জন্ম হয়েছে, যা সে আগে কখনও অনুভব করেনি। গত সাত মাস কোনো পুরুষের ছোঁয়া না পাওয়া শরীরটা যেন কেবল সায়েমের অপেক্ষাতেই ছিল। নীলা জানত না সায়েমের মধ্যে কী এমন জাদুকরী শক্তি আছে, কিন্তু তার গভীর চোখের চাউনি আর গম্ভীর কণ্ঠস্বর নীলার দীর্ঘদিনের সাজানো ‘সংকল্প’ বা 'রেজোলিউশন' ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। প্রথম রাতের সেই উন্মাদনা সেদিন ছিল এক মেঘলা রাত। নীলার ড্রয়িংরুমে বসে তারা কফি খাচ্ছিল। নীলার মনে কোনো অভিসন্ধি ছিল না; সে কেবল সায়েমের সান্নিধ্য চেয়েছিল। কিন্তু সায়েম যখন কাছে এসে নীলার কপালে আলতো করে চুমু খেল এবং খুব ধীর স্বরে কথা বলতে শুরু করল, নীলা যেন সম্মোহিত হয়ে গেল। সায়েমের পুরুষালি সুবাসে নীলা মাতাল হয়ে যাচ্ছিল। নীলা নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু সায়েমের হাতের ছোঁয়া যখন তার ...

रंग, प्रेम और कला: एक अधूरी दास्तान | Hindi Romantic Story for Artists

कला एक ऐसी भाषा है जिसकी कोई सीमा नहीं होती। यह भावनाओं को, छुअन को और रंगों को एक ऐसे कैनवास पर उकेरती है जो शब्दों से परे होता है। भारत जैसे देश में, जहाँ कला और संस्कृति की जड़ें बहुत गहरी हैं, प्रेम को अक्सर एक आध्यात्मिक और दिव्य रूप में देखा गया है। लेकिन कभी-कभी, दो अलग-अलग पीढ़ियों, दो अलग-अलग दृष्टिकोणों के बीच का प्रेम भी रंगों की तरह आपस में घुल-मिल जाता है। यह कहानी है एक ऐसे चित्रकार की, जिसकी उम्र के इस पड़ाव पर कला ही उसका सब कुछ थी, और एक ऐसी युवा लड़की की जो रंगों की दुनिया में अपनी पहचान बनाना चाहती थी। पहला अध्याय: कला की दुनिया और मुलाकात मैं लगभग पैंतीस साल का हूँ और बारह साल की उम्र से कला और रंगों की दुनिया में डूबा हुआ हूँ। मेरी आँखों ने रंगों के अनगिनत शेड्स देखे हैं, लेकिन जब आप एक ऐसे शहर में रहते हैं जहाँ युवा और ऊर्जावान छात्र-छात्राएं कला सीखने आते हैं, तो जीवन का नजरिया थोड़ा बदल जाता है। यहाँ एक प्रसिद्ध कला महाविद्यालय है, जहाँ के छात्रों के पास अभी सीखने के लिए बहुत कुछ है। लेकिन हर नए सेमेस्टर के साथ, जीवन में कुछ नई ऊर्जा, कुछ नए रंग और कुछ ताज़गी जर...