আমি তখন ছাত্রাবাসে থাকতাম, আর ওরা নিজেদের পরিবার নিয়ে শহরের দক্ষিণ অংশে বসবাস করত। সে এলাকায় সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটত। আমি সেসব অনুষ্ঠানে অনেকবার অংশ নিয়েছি, আর প্রতিবারই নতুন কিছু অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।
সেদিন কলকাতার শীত তার চূড়ান্ত রূপে ছিল। কুয়াশাচ্ছন্ন সন্ধ্যা, রাস্তায় জমে থাকা শিশির, আর হালকা শীতল বাতাস শহরটাকে এক অন্যরকম অনুভূতি দিচ্ছিল। আমি জানতাম কলকাতার শীত এমনই হয়, কিন্তু যা জানতাম না, তা হলো, সেদিন রেস্তোরাঁর টেবিলে বসে থাকা আমার পুরনো এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে!
অভীক রায়—আমার স্কুলজীবনের বন্ধু, যাকে আমি বহু বছর দেখিনি। আমি জানতাম না যে, সে আমার বন্ধুদেরও ঘনিষ্ঠ। আমাদের বন্ধুত্বের বন্ধন ছিল গভীর, এবং পুরনো সেই সম্পর্কের উষ্ণতা সেদিন আবার ফিরে এল। আমরা অনেকক্ষণ গল্প করলাম, পুরনো স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে আনলাম। একসময় ঠিক করলাম, আবার একদিন দেখা করব, শুধু আমরা দু’জন, পুরনো দিনের কথা বলব।
সেই পরিকল্পনামতো আমরা কয়েকদিন পর আবার এক রেস্তোরাঁয় বসেছিলাম। গভীর রাত পর্যন্ত গল্প চলল—ছেলেবেলার দুষ্টুমি, যৌবনের প্রথম প্রেম, আর নানা রোমাঞ্চকর মুহূর্তের কথা।
কিন্তু কয়েক বছর পর, আমাদের দেখা হলো এক অন্য পরিবেশে। তখন আমি প্রবাসী বাঙালিদের এক সংগঠনে কাজ করছিলাম। অভীক এল সেখানে, এবং সেই সময়ে সে আমাকে এক অদ্ভুত প্রেমের গল্প শোনাল, যা ঘটেছিল নতুন বছরের ঠিক পরেই, যখন সে কলকাতা থেকে ট্রেনে উঠেছিল শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে।
এক অপ্রত্যাশিত প্রেমের গল্প
ট্রেনের কামরায় অভীকের পাশেই বসেছিল দুই তরুণী। তাদের মধ্যে একজন, যার নাম সঞ্জনা সেন, শুরু থেকেই অভীকের দিকে একটু বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছিল। তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত আকর্ষণ। ট্রেনের ঝাঁকুনিতে তাদের কথা হতে শুরু করল। কুয়াশার ঢাকা পথে, ট্রেন যখন অন্ধকার টানেলে ঢুকল, সঞ্জনা হঠাৎ করেই অভীকের হাত চেপে ধরল।
প্রথম দর্শনেই প্রেম? মনে হয়েছিল তাই!
সঞ্জনা ছিল দীর্ঘকায়, ছিপছিপে গড়নের এক সুন্দরী মেয়ে। তার লম্বা, ঢেউ খেলানো চুল, উজ্জ্বল বাদামি চোখ, আর পরিপাটি পোশাক অভীকের মনে এক নতুন অনুভূতি সৃষ্টি করল। সে পরেছিল দামী সিল্কের শাড়ি, সাথে হালকা পারফিউম, যা কামরায় এক মোহময়ী সুবাস ছড়াচ্ছিল।
অন্যদিকে, অভীক ছিল সুঠাম দেহের, সুগঠিত কাঁধ ও শক্তপোক্ত শরীরের এক আত্মবিশ্বাসী যুবক। সে নিয়মিত শরীরচর্চা করত, তাই দেখতে ছিল যেন কোনো অ্যাথলিট।
ট্রেনে যে প্রেম শুরু হয়েছিল, সেটি চলতে থাকে শিলিগুড়িতেও। শহরে পৌঁছানোর পর অভীক দু'জন মেয়েকেই তার ফ্ল্যাটে কফির জন্য আমন্ত্রণ জানায়। সঞ্জনা সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়, আর তার বান্ধবী কিছুক্ষণ পর চলে যায়, রেখে যায় সঞ্জনাকে অভীকের সাথে একান্তে।
রাতভর তাদের ভালোবাসার এক নতুন অধ্যায় লেখা হয়। নতুন বছরে এক নতুন সম্পর্ক জন্ম নেয়, যেখানে উষ্ণতা আর আবেগ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
প্রেম নাকি শুধুই আকর্ষণ?
কিন্তু এখানে একটি সমস্যা ছিল।
অভীকের কলকাতায় ইতিমধ্যেই একটি প্রেমিকা ছিল—অর্পিতা। সে জানত না, অভীক অন্য কারও সাথে রাত কাটিয়েছে। অভীক ঠিক করেছিল, সঞ্জনার সঙ্গে তার এই সম্পর্ক শুধুমাত্র সাময়িক মজা।
কিন্তু সঞ্জনা তা জানত না। সে বিশ্বাস করেছিল যে, অভীক তার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
এই নতুন সম্পর্ক অভীকের মনে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করল। একদিকে, অর্পিতা ছিল ঘরোয়া, শান্ত স্বভাবের মেয়ে, যে তার স্বামী ও পরিবারের জন্য পুরোপুরি নিজেকে উৎসর্গ করতে পারবে। অন্যদিকে, সঞ্জনা ছিল রোমাঞ্চপ্রিয়, আগ্রাসী, আর ভালোবাসায় সম্পূর্ণভাবে আত্মনিবেদিত।
সঞ্জনার অর্থবিত্তেরও অভাব ছিল না। তার নিজের একটি বিউটি পার্লার ছিল, যা শিলিগুড়ির অন্যতম জনপ্রিয় সৌন্দর্যকেন্দ্র। শহরের বিখ্যাত মডেল, অভিনেত্রী, আর উচ্চবিত্ত পরিবারের মহিলারা তার ক্লায়েন্ট ছিল। অভীক যখন সঞ্জনার সাথে কাটাতে শুরু করল, তখন সে লক্ষ্য করল যে সঞ্জনা তাদের প্রতিটি ডেটের খরচ বহন করছে—হোটেল, রেস্টুরেন্ট, এমনকি বাইরে ঘুরতে যাওয়ার খরচও!
বিদেশের সফর, প্রেমের পরিণতি
সঞ্জনার পরিকল্পনায় তারা ভারত ছেড়ে প্রথমে ইতালি যায়, তারপর ফ্রান্স, অবশেষে অস্ট্রিয়া। তারা যখন ভিয়েনা পৌঁছায়, অভীকের শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তার প্রেমের উন্মাদনা ফিকে হয়ে আসে। সঞ্জনা সেটা বুঝতে পারে, কিন্তু বিরক্ত হয় না। বরং সে অভীককে বিশ্রাম নিতে সাহায্য করে, যেন সে আবার আগের মতো হয়ে ওঠে।
অবশেষে তারা যখন শিলিগুড়িতে ফিরে আসে, সঞ্জনা ইতালিতে কাজের একটি সুযোগ পায়। তার পুরনো এক বন্ধু তাকে একটি বড় প্রসাধনী ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করার প্রস্তাব দেয়। এক মাসের মধ্যেই সে ইতালিতে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
অভীক এই সুযোগটাকে স্বস্তির নিঃশ্বাস হিসেবে নিল। সে আবার তার প্রেমিকা অর্পিতার কাছে ফিরে গেল, আর তাকে বোঝাল যে সে পড়াশোনার জন্য বাইরে ছিল।
কিন্তু এক বছর পর, সঞ্জনা হঠাৎ অভীকের কাছে এক চিঠি পাঠায়। সে জানতে পারে, অভীক বিয়ে করছে! কিন্তু অভীকও এক অদ্ভুত শর্ত পাঠায়—সে চায়, সঞ্জনাও যেন বিয়ে করে, তবে তাদের গোপন প্রেম যেন শেষ না হয়!
সঞ্জনা কয়েক মাস অভীকের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেনি। কিন্তু একদিন, মিলান থেকে এক ফোন এল।
সঞ্জনা অভীককে আমন্ত্রণ জানাল মিলানে আসতে। সে বলল, প্লেনের টিকিট সে নিজেই পাঠিয়ে দেবে।
অভীক কলকাতায় অর্পিতাকে বলল, সে দিল্লি যাচ্ছে পরীক্ষার জন্য। কিন্তু বাস্তবে সে উড়ে গেল মিলান।
এবং সেখানে গিয়ে দেখল—সঞ্জনা ইতিমধ্যে এক ইতালীয় প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে! অভীককে সে পরিচয় করিয়ে দিল তার "কাজিন" হিসেবে।
অভীক নির্বাক হয়ে গেল। একসময় যে নারী তার জন্য পাগল ছিল, সে এখন তাকে দূরে সরিয়ে দিল!
সেই দিনের পর, অভীক বুঝে গিয়েছিল—জীবন সত্যিই এক কঠিন শিক্ষক!
(সমাপ্ত)

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন