১
কলকাতা শহরের ব্যস্ততা যেন কখনও থামে না। তবুও, শহরের কোলাহলের মাঝেও এক টুকরো নির্জনতা পাওয়া যায়, ঠিক যেমন অর্পিতার জীবন ছিল—বাইরে থেকে ঝলমলে, কিন্তু ভেতরে একান্তই নিঃসঙ্গ।
সে এখন মুম্বাইয়ের এক পাঁচতারা হোটেলের লবিতে বসে আছে, হাতে এক কাপ কফি, দূরে তাকিয়ে আছে জানালার কাঁচের ওপারে নীল সমুদ্রের দিকে। হঠাৎ, পিছন থেকে পরিচিত এক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—
“অর্পিতা!”
সে অবাক হয়ে ঘুরে তাকায়। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার পুরনো বন্ধু, বরুণ। তাদের শেষ দেখা হয়েছিল কলকাতায়, প্রায় দশ বছর আগে। তারপর সে হঠাৎ করেই হারিয়ে গিয়েছিল, কোথায় যেন চলে গিয়েছিল কোনো খবর না দিয়েই।
“বরুণ?”
“তুমি এখানে?”
“আমি এখানে থাকছি কয়েকদিনের জন্য। কিন্তু তুমিই বা কোথায় ছিলে এতদিন?”
বরুণ একটু হাসল, তারপর বলল, “সে এক দীর্ঘ গল্প।”
গল্পটা শুরু হয়েছিল অনেক আগে, কলকাতার এক ছোট্ট শহরতলীতে। অর্পিতা এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা মেয়ে, আর বরুণ এক ধনী ব্যবসায়ীর ছেলে। তবুও, তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত রসায়ন ছিল।
কিন্তু বরুণ হঠাৎ করেই কলকাতা ছেড়ে চলে গিয়েছিল। অর্পিতা জানতে পারেনি কোথায়, কেন। অনেক খোঁজ করেছিল, কিন্তু কোনো উত্তর মেলেনি।
এখন, এত বছর পর তারা আবার একে অপরের সামনে দাঁড়িয়ে।
২
কফির কাপ হাতে নিয়ে তারা হোটেলের লাউঞ্জে বসল।
“তাহলে?” অর্পিতা প্রশ্ন করল, “কোথায় ছিলে এতদিন?”
বরুণ একটু চুপ করে রইল, তারপর বলল, “আমি বিয়ে করেছিলাম, অর্পিতা। আর তারপর আমেরিকায় চলে যাই। আমার স্ত্রী অনন্যার সাথে ওখানে ব্যবসা শুরু করি। প্রথমদিকে জীবনটা দারুণ চলছিল। ও খুব ভালোবাসত আমাকে, আমিও চেষ্টা করেছিলাম সুখী হতে। কিন্তু...”
একটু থেমে সে গভীর শ্বাস নিল, “বিয়ের কয়েক বছর পর আমাদের সন্তান হওয়ার আশা শেষ হয়ে গেল। ডাক্তার জানাল, অনন্যা কখনো মা হতে পারবে না। এটা ওর জন্য ভীষণ কঠিন ছিল।”
অর্পিতা ধীরে ধীরে বলল, “তারপর?”
“আমাদের সম্পর্কের উপর প্রভাব পড়তে শুরু করল। প্রথমে আমরা দুজনেই মন খারাপ করতাম, কিন্তু ধীরে ধীরে অনন্যার মধ্যে একটা পরিবর্তন আসতে লাগল। ও আরও বেশি স্বাধীন হয়ে উঠল, শারীরিক ঘনিষ্ঠতার প্রয়োজনও যেন বেড়ে গেল। আমি চেষ্টা করতাম ওর সব চাহিদা পূরণ করতে, কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, আমি ওর জন্য যথেষ্ট নই।”
৩
সেদিন রাতে, অর্পিতা অনেকক্ষণ ধরে বরুণের কথা ভাবল। এত বছর পর, সে হঠাৎ ফিরে এলো তার জীবনে, এবং এত রহস্য, এত না-বলা কথা নিয়ে।
পরের দিন বরুণ আবার দেখা করতে চাইল।
তারা এক রেস্তোরাঁয় বসেছিল, বরুণ বলছিল অনন্যার কথা—কীভাবে সে এক নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ল, কীভাবে বরুণ সেটা মেনে নিতে বাধ্য হলো।
“আমি চুপ করে ছিলাম, কারণ আমি জানতাম, এটা আমার হাতের বাইরে। আমি চাইনি ওর জীবন থেকে চলে যেতে, তাই কিছু বলিনি।”
“এখন?”
বরুণ হাসল। “এখন আমি আর চুপ করে নেই।”
অর্পিতা জানত, এই সম্পর্কটা ঠিক বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তার নিজের হৃদয়ের শব্দ সে শুনতে পাচ্ছিল।
৪
মুম্বাইয়ের রাতটা উষ্ণ ছিল। হোটেলের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল তারা, দু’জনেই একসাথে, সমুদ্রের বাতাসে চুল উড়ে যাচ্ছে।
“তুমি জানো, আমি কখনো ভুলিনি তোমাকে,” বরুণ বলল।
অর্পিতা একটু চমকে গেল, “কিন্তু এত বছর ধরে তুমি কিছু বলোনি।”
“কারণ আমি জানতাম, আমার জীবনে তখন অন্য কেউ ছিল। আমি তোমাকে আবার হারাতে চাইনি।”
অর্পিতা ধীরে ধীরে বরুণের দিকে তাকাল। তার চোখে সত্যের ঝলক দেখল।
তারা একে অপরের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। বরুণ হাত বাড়িয়ে তার গাল ছুঁয়ে দিল, “তুমি কি এখনো আগের মতোই অনুভব করো?”
অর্পিতা কোনো উত্তর দিল না, শুধু চোখ বন্ধ করল। তারপর তাদের ঠোঁট মিলিত হলো, ধীর, তীব্র ভালোবাসায়।
৫
তারা একসাথে অনেক সময় কাটাল মুম্বাইয়ে। শহরের রাস্তায় ঘুরল, সমুদ্রের ধারে বসে রইল, যেন এত বছরের দূরত্ব এক নিমিষেই মুছে গেল।
এক রাতে, তারা এক রিসর্টে ছিল, সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দে ঘর ভরে উঠছিল।
“তুমি কি জানো, কতদিন ধরে আমি তোমার অপেক্ষায় ছিলাম?” বরুণ বলল, তার আঙুল অর্পিতার চুলের মধ্যে জড়িয়ে রাখল।
“তুমি কি জানো, কতদিন ধরে আমি তোমাকে খুঁজেছি?”
বরুণ তাকে আরও কাছে টেনে নিল, “আমাদের কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে?”
অর্পিতা একটু চুপ করে রইল।
“আমি জানি না, বরুণ। আমি শুধু জানি, এই মুহূর্তটা সত্যি।”
৬
কিন্তু সব প্রেমের গল্পে একটা মোড় আসে।
তারা যখন মুম্বাই থেকে গোয়ায় গিয়েছিল, এক বিকেলে রিসর্টের করিডরে হঠাৎ অর্পিতা বরুণের পরিচিত এক মুখ দেখতে পেল।
বরুণের স্ত্রী অনন্যা!
সে আরেকজনের সাথে ছিল, কিন্তু যখন বরুণ আর অর্পিতাকে একসাথে দেখল, তাদের চাহনিতে কী যেন একটা বুঝতে পারল।
কোনো কথা হয়নি, কেউ কিছু বলেনি। কিন্তু সেই মুহূর্তে, একটা সত্য উন্মোচিত হলো—তারা সবাই জানে, কিন্তু কেউ বলবে না।
৭
পরের দিন সকালে, বরুণ অর্পিতার কাছে এসে বলল, “আমাদের আর দেখা করা উচিত নয়, তাই না?”
অর্পিতা একটু হাসল, “তুমি কি চাইছ আমি বলি যে আমাদের ভুল ছিল?”
বরুণ গভীরভাবে তাকাল তার চোখে, “আমি শুধু চাই তুমি সুখী হও।”
অর্পিতা চোখ নামিয়ে নিল।
“তাহলে বলো, তুমি সুখী হবে কি না আমার সাথে?”
একটা মুহূর্তের নীরবতা।
তারপর অর্পিতা বলল, “আমি জানি না, বরুণ। কিন্তু আমি জানি, এই অনুভূতিটা সত্যি। আর আমি চাই না এটা হারিয়ে যাক।”
বরুণ একবার তার হাতে হাত রাখল, তারপর ধীরে ধীরে তাকে আলিঙ্গন করল।
“আমরা দেখব। ভবিষ্যৎ কী আছে, কে জানে?”
তারা জানত, কিছু গল্পের শেষ হয় না—সেগুলো শুধু সময়ের সাথে বদলে যায়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন