
Telegram
বৈশাখের এক দুপুর। ছায়া ঢাকা সরু রাস্তার পাশে সারি সারি কৃষ্ণচূড়া গাছ, লাল ফুলে ভরে গেছে চারপাশ। এমন এক ছোট শহরে, যেখানে সময় যেন একটু ধীরে চলে, সেখানে কর্মসূত্রে এসেছিল অর্ণব। কলকাতার ছেলে, ব্যস্ত শহরের অভ্যস্ত জীবন ছেড়ে এক অজানা জায়গায় এসে একটু অনভ্যস্ত লাগছিল।
সকাল থেকেই অর্ণবের দাঁতে হালকা ব্যথা ছিল। শহরে কারো কাছে পরিচিত ছিল না, তাই স্থানীয় একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে নাম লেখালো। বিকেলে যখন ডাক এলো, ক্লিনিকে ঢুকেই সে তাকিয়ে রইল—তার সামনে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত সুন্দরী মেয়ে। সাদা কোটের নিচে হালকা নীল সালোয়ার-কামিজ, চুল একপাশে বাঁধা। নাম তার ঈশা।
"বসুন, আমি দেখছি," ঈশা বলল মিষ্টি হেসে।
অর্ণব একটু ইতস্তত করল। মেয়েটির হাসিতে যেন একটা অদ্ভুত শান্তি আছে। ঈশা ধীরে ধীরে চেয়ার পিছিয়ে দিল, হালকা ঝুঁকে এসে মুখের ভেতর দেখল। খুব কাছে চলে আসায় ঈশার পারফিউমের মিষ্টি গন্ধ পেল অর্ণব।
"এটা তো খুব একটা বড় সমস্যা না, একটা রুটিন চেকআপ লাগবে," ঈশা বলল।
অর্ণব হেসে বলল, "সত্যি? আপনি বলার পর থেকেই ব্যথাটা কম মনে হচ্ছে!"
ঈশা মুচকি হেসে বলল, "আপনারা ছেলেরা সব এমনই। একটু হাসলেই ব্যথা ভুলে যান!"
অর্ণব বুঝল, ঈশা শুধু ভালো ডেন্টিস্ট নয়, তার বুদ্ধিও তীক্ষ্ণ।
আবার দেখা
ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে এলেও ঈশার মুখটা মন থেকে সরছিল না অর্ণবের। কাজের সূত্রে শহরে কয়েকদিন থাকতে হবে, তাই ভাবল, ঈশাকে আরেকবার দেখার উপায় বের করতে হবে।
দু’দিন পর, শহরের এক ছোট্ট ক্যাফেতে কফি খেতে গিয়েছিল অর্ণব। দরজায় ঢুকতেই দেখতে পেল ঈশা একা বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। অর্ণব সুযোগ হারাল না।
"আপনার অনুমতি ছাড়াই পাশে বসছি," বলে হাসল অর্ণব।
ঈশা তাকিয়ে হেসে বলল, "আপনার দাঁতের ব্যথা কি তাহলে একেবারেই কমে গেছে?"
"হ্যাঁ, তবে মনে হচ্ছে নতুন একটা সমস্যা হয়েছে," অর্ণব বলল কপট গাম্ভীর্যে।
"কী সমস্যা?"
"মনে হচ্ছে, আপনার সঙ্গে না দেখা হলে মনের মধ্যে একটা ফাঁকা ভাব কাজ করে!"
ঈশা একটু চমকে গেলেও হেসে বলল, "আপনি কিন্তু বেশ চতুর, মিস্টার অর্ণব!"
সে দিন চায়ের কাপে অনেক গল্প হলো। অর্ণব জানল, ঈশা এই ছোট শহরেই জন্মেছে, বাবা-মা দুজনেই ডাক্তার ছিলেন, কিন্তু দুবছর আগে এক দুর্ঘটনায় দুজনকেই হারিয়েছে। এরপর থেকে একাই থাকে, নিজের চেম্বারে কাজ করে, আর কিছু অনাথ বাচ্চাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়।
ঈশার গল্প শুনে অর্ণবের মন ছুঁয়ে গেল। মেয়েটি যেমন হাসিখুশি, তেমনি তার জীবনের গভীরতাও অনেক।
প্রেমের শুরু
এরপর থেকে ঈশা আর অর্ণব প্রায়ই দেখা করতে লাগল। একসঙ্গে শহরের পুরোনো মন্দির দেখা, নদীর ধারে বসে গল্প করা, সন্ধ্যায় লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়া—সবকিছুই যেন ধীরে ধীরে তাদের একসূত্রে বেঁধে ফেলছিল।
একদিন নদীর ধারে বসে ঈশা চুপচাপ ছিল।
"কী হলো?" অর্ণব জিজ্ঞেস করল।
"তুমি চলে গেলে কী হবে?" ঈশা ধীরে বলল।
"তুমি চাইলে আমি কোথাও যাব না," অর্ণব গভীরভাবে বলল।
ঈশা কিছু বলল না, শুধু মৃদু হাসল।
ভালোবাসার স্বীকারোক্তি
একদিন রাতের বৃষ্টি। অর্ণবের হোটেল থেকে ফোন এল, "বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, একা একা বসে ভালো লাগছে না। একটু বেরোব?"
ঈশা প্রথমে না করলেও, পরে রাজি হয়ে গেল।
বৃষ্টি ভেজা রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট দোকানে গরম চা আর সিঙ্গাড়া খেতে খেতে ঈশা বলল, "জানো, এই শহরটা ছাড়া আমার আর কিছু নেই। আমি এখানেই থাকতে চাই।"
অর্ণব ঈশার হাতটা ধরল, "আমি তো শুধু তোমার শহর নয়, তোমার পুরো জীবনটা চাই!"
ঈশা চুপচাপ তাকিয়ে রইল অর্ণবের দিকে। চোখ দুটো চিকচিক করছিল।
"তুমি কি জানো, অর্ণব, জীবনে প্রথমবার কারও জন্য ভয় পাচ্ছি?" ঈশা ফিসফিস করে বলল।
"কেন?"
"কারণ আমি বুঝতে পারছি, তোমাকে ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছি না।"
অর্ণব ঈশার হাতটা শক্ত করে ধরল, "তাহলে তো ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমিও তোমাকে ছাড়া কিছু ভাবতে পারছি না!"
বৃষ্টির মধ্যে ধীরে ধীরে হাতের মুঠো শক্ত হলো, মনে হলো, সময় যেন এই মুহূর্তেই থেমে গেল।
শেষ কথা
অর্ণবের শহরে ফেরার দিন এসেই গেল। বিমানবন্দরের দিকে যেতে যেতে ঈশা খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিল।
"আমি তো বলেছি, আমি এখানেই থাকব," অর্ণব বলল।
ঈশা তাকিয়ে বলল, "তুমি কি নিশ্চিত?"
"তোমার চোখের দিকে তাকালে কোনো কিছু নিয়েই সংশয় থাকে না," অর্ণব বলল।
ঈশা এবার আর নিজেকে আটকাল না। ধীরে কাছে এসে অর্ণবকে জড়িয়ে ধরল।
ছোট শহরের একটা রাস্তা। কৃষ্ণচূড়ার নিচে দাঁড়িয়ে দুটো মানুষ। তাদের ভালোবাসার গল্প এখান থেকেই শুরু হলো।
এই গল্পে কোনো চটুলতা নেই, শুধুই ভালোবাসার এক গভীর অনুভূতি। সত্যিকারের প্রেম এভাবেই জন্ম নেয়—আস্তে আস্তে, নীরবে, অথচ গভীরভাবে!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন