সন্ধ্যা নামছে। জারা ক্লান্ত শরীরে বাথটাবে বসে আছেন। গরম পানির স্পর্শে যেন সারাদিনের পরিশ্রম ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। বাতাসে গোলাপ আর ল্যাভেন্ডারের মিশ্রিত সুবাস। চোখ বন্ধ করতেই কেকের সুগন্ধ, মাখনের মোলায়েম স্বাদ, আর চুলার উষ্ণতা যেন মনের পর্দায় ভেসে উঠল। বেকারি তার ভালোবাসা, তার পরিচয়।
জারা পেশায় একজন দক্ষ বেকার। তার তৈরি করা কেক শুধু দেখতে সুন্দর নয়, স্বাদেও অতুলনীয়। প্রতিটি কেকের পেছনে তার যত্ন, ভালোবাসা আর নিখুঁত শিল্পকর্মের ছাপ থাকে। বিশেষ করে যখন কোনো বিয়ের কেক বানান, তখন সেই কেক যেন কেবল মিষ্টির নয়, একটি স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
কিছুদিন আগের কথা মনে পড়ল জারার। ইরফান আর তার বাগদত্তার জন্য তিনি একটি তিন তলা বিশাল ওয়েডিং কেক তৈরি করেছিলেন। ওরা দু'জন খুব খুশি ছিল, বিশেষ করে ইরফানের চোখে একটা আলাদা উজ্জ্বলতা ছিল। তিনি খুব যত্ন করে কেকের প্রতিটি স্তরে সূক্ষ্ম নকশা এঁকেছিলেন, যেন ভালোবাসার এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি হয়।
কিন্তু আজ… আজ কেমন যেন অস্থির লাগছে।
হঠাৎ কলিং বেলের শব্দে ধ্যান ভাঙল। গায়ে তোয়ালে জড়িয়ে দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে ইরফান। চোখেমুখে বিষাদ, ক্লান্ত দৃষ্টি।
— "তুমি এখানে? এত রাতে?"
ইরফান ম্লান হাসল, "ভেতরে আসতে পারি?"
জারা সরে দাঁড়াতেই সে ভেতরে এল। সোফায় বসে মাথা নিচু করল। কিছুক্ষণ নিঃশব্দ থাকার পর ধীরে ধীরে বলল, "বিয়ে ভেঙে গেছে, জারা। ও অন্য একজনকে ভালোবেসেছে। আমাদের ফুলের সাজসজ্জার ডিজাইনারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল ওর।"
জারা বিস্মিত হলো। ইরফান আর তার বাগদত্তাকে একসঙ্গে দেখে মনে হয়েছিল তারা সত্যিই সুখী। কিন্তু সত্যি কি তাই ছিল?
— "আমি দুঃখিত, ইরফান।"
— "আমি ভেবেছিলাম, ওর সঙ্গে একটা সুন্দর জীবন কাটাবো। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।"
জারা কিচেনে গিয়ে দু’কাপ কফি বানাল। ইরফানের হাতে এক কাপ তুলে দিয়ে পাশে বসে বলল, "এটা খাও, তোমার ভালো লাগবে।"
ইরফান কফিতে এক চুমুক দিল। কফির গরম ধোঁয়া যেন কিছুটা উষ্ণতা ফিরিয়ে দিল তার মুখে।
— "তুমি জানো, আমি তোমার বেকারিতে প্রথম যেদিন গিয়েছিলাম, সেদিন তোমাকে কাজ করতে দেখে অবাক হয়েছিলাম। এত ভালোবাসা নিয়ে কেউ কি কাজ করতে পারে?"
জারা হেসে বলল, "খাদ্য তো শুধু খাবার নয়, ইরফান। এতে আবেগ মেশানো থাকে।"
— "তাই তো! কিন্তু জানো, আজ যখন আমি ওর চলে যাওয়ার খবর পেলাম, তখন মনে হলো আমার জীবন থেকে সমস্ত স্বাদ হারিয়ে গেছে।"
জারা ইরফানের দৃষ্টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করল। তার চোখে ছিল হতাশার ছাপ, কিন্তু একেবারে ভেঙে পড়েনি। যেন কোথাও একটা আশা লুকিয়ে আছে।
— "জীবন থেমে থাকে না, ইরফান। তোমার জন্যও কিছু অপেক্ষা করছে।"
— "কিন্তু কী?"
— "সেটা সময়ই বলবে," জারা মৃদু হেসে বলল।
সেই রাতে ইরফান আর জারা অনেক কথা বলল। ভালোবাসা, হারানোর যন্ত্রণা, নতুন করে শুরু করার সাহস—সব কিছু নিয়ে। ইরফান ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিল, তার জীবন এখানেই থেমে থাকেনি।
কয়েকদিন পর ইরফান আবার এল। কিন্তু এবার তার চোখে সেই হতাশা ছিল না।
— "তুমি কি ব্যস্ত?"
— "সবসময় ব্যস্ত, তবে তোমার জন্য সময় বের করতে পারি," হাসল জারা।
— "তাহলে একটা কেক বানাও তো!"
— "কী উপলক্ষ?"
— "নতুন করে বাঁচার উপলক্ষ!"
জারা অবাক হলো। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই একটা উষ্ণ অনুভূতি বুকের মধ্যে ছড়িয়ে গেল।
— "তাহলে চলো, দু’জনে মিলে বানাই।"
সেদিন প্রথমবার ইরফান বেকারির কিচেনে ঢুকল। ময়দা, চিনি, ডিম—সব কিছু হাতে নিয়ে সে যেন নতুন এক অনুভূতি পেল। জারার নির্দেশনা মেনে সে কেক বানানোর চেষ্টা করল, আর জারা খেয়াল করল—তার ক্লায়েন্ট ইরফান, আজ শুধুই একজন ক্লায়েন্ট নয়।
জারা অনুভব করল, ইরফানের প্রতি তার অনুভূতি কেমন যেন বদলে যাচ্ছে। কেকের মতোই ধীরে ধীরে এক মিষ্টি সম্পর্ক গড়ে উঠছে তাদের মাঝে।
শেষ পর্যন্ত কেক তৈরি হলো। ইরফান এক টুকরো মুখে তুলে নিতেই বিস্মিত হলো, "অসাধারণ!"
— "আমি তো বলেছিলাম, খাবারে আবেগ মেশানো থাকে," হাসল জারা।
ইরফান তাকাল জারার দিকে। এই মেয়েটি শুধু কেক বানায় না, সে জীবনকেও মিষ্টি করে তোলে।
সেই রাতের পর থেকে ইরফান প্রায়ই আসতে লাগল। কখনও কফির ছলে, কখনও নতুন কেক শেখার অজুহাতে। আর জারা? সে কখনোই তাকে ফিরিয়ে দেয়নি।
এক সন্ধ্যায় ইরফান এসে বলল, "জারা, আমি বুঝতে পেরেছি, ভালোবাসা শুধু একবার আসে না। কখনও কখনও, সেটা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, ঠিক যেমন একটা কেক তৈরি হয়—প্রতিটি উপাদান নিখুঁতভাবে মেশানোর পরই সেটা সঠিক স্বাদ পায়।"
জারার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। সে কিছু বলার আগেই ইরফান বলল, "তুমি কি আমার জীবনের কেকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে চাও?"
জারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর মৃদু হেসে বলল, "আমি যদি বলি, আমি তো আগে থেকেই ছিলাম?"
ইরফানের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আর সেদিন প্রথমবারের মতো জারার বেকারিতে শুধু কেকের নয়, ভালোবাসারও এক নতুন গল্প লেখা হলো।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন