সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

এক আকস্মিক সাক্ষাৎ

bangla premer golpo

ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরো শহরে একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে গিয়েছিলাম। সম্মেলনের বিষয় ছিল "রাষ্ট্র ও ধর্ম"। এটি ছিল আমার জন্য একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা, কারণ এতে বিভিন্ন দেশের বুদ্ধিজীবী এবং গবেষকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ পাই। তবে, আমার এই সফরের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় ঘটনা ছিল এক ভারতীয় ব্যক্তির সঙ্গে আকস্মিক সাক্ষাৎ, যিনি বহু বছর আগে দেশ ছেড়ে ব্রাজিলে চলে এসেছিলেন।

এটি ছিল কোপাকাবানা সমুদ্রসৈকতের একটি রেস্তোরাঁয়, যেখানে আমার স্ত্রীকে বাংলায় কথা বলতে দেখে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তিনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— "আপনারা কি বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছেন?"

আমি উত্তরে জানালাম, "আমি পশ্চিমবঙ্গ থেকে, আর আমার স্ত্রী বাংলাদেশ থেকে।" বৃদ্ধের চোখে জল এসে গেল। যেন এতদিন পরে তিনি নিজের পরিচিত পৃথিবীর কিছু খুঁজে পেলেন। তার নাম ছিল অনন্ত রায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তাকে দেশত্যাগ করতে হয়েছিল। তিনি তখন একজন সৈনিক ছিলেন, কিন্তু মিথ্যা অভিযোগে তাকে দেশদ্রোহী বলা হয়। প্রাণ বাঁচাতে তিনি ও তার দুই বন্ধু ভারতের তৎকালীন সীমান্ত পেরিয়ে গ্রীসে পালিয়ে যান এবং সেখান থেকে বহু কষ্ট করে ব্রাজিলে আসেন।

আমি তার কথা শুনে মুগ্ধ হলাম। এত বছর পরেও তিনি তার দেশকে ভুলতে পারেননি। তিনি বললেন,
— "আপনারা আমার কাছে একটুখানি ভারতবর্ষ নিয়ে এসেছেন। এই দেশ আমাকে আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু মন পড়ে আছে আমার মাতৃভূমিতে।"

এক বিস্ময়কর কাহিনি

রাতের খাবার খেতে খেতে অনন্তবাবু আমাকে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু সুরেশ ঘোষ-এর গল্প বললেন, যিনি আসলে আমার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়। সুরেশ বাবু ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন ও শিক্ষিত মানুষ। দেশত্যাগের সময় তিনি নববিবাহিত ছিলেন, তার স্ত্রী প্রভা আর একমাত্র ছেলে সোমনাথ তখন তার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু তিনি কখনও ফিরে যেতে পারেননি।

প্রভা দশ বছর অপেক্ষা করেছিলেন, আশায় ছিলেন যে একদিন তার স্বামী ফিরে আসবেন। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পর, একদিন তিনি সিদ্ধান্ত নেন পুনরায় সংসার বাঁধার। তিনি অন্যত্র বিবাহ করেন, কিন্তু তার ছেলে সোমনাথ নতুন সংসারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেননি। এক সময় তিনি কলকাতায় চলে যান, সেখান থেকে পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। সোমনাথের এক মেয়ে ও এক ছেলে, যারা এখন ইউরোপে গবেষণার কাজ করছে।

এই গল্প শোনার পর আমার মনে কৌতূহল জন্মাল। আমি অনন্তবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম,
— "সুরেশবাবুর পরবর্তীকালে কী হলো?"

অনন্তবাবু হাসলেন এবং বললেন, "এবার তোমাকে সত্যিকারের এক প্রেমকাহিনি শোনাবো।"

অজানা শহরে প্রেমের সন্ধান

সুরেশবাবু রিও ডি জেনেইরোতে বন্দরে কাজ শুরু করেছিলেন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তিনি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হয়ে উঠলেন। কিন্তু তার মনের মধ্যে ছিল এক শূন্যতা— তার হারিয়ে যাওয়া স্ত্রী ও সন্তান।

একদিন সন্ধ্যায়, হঠাৎ তার দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়। দরজা খুলে দেখেন, এক অচেনা সুন্দরী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে বিব্রত হয়ে বলল,
— "আমি ভুল করে এখানে চলে এসেছি। আমি আসলে অন্য কারও বাড়ি খুঁজছিলাম।"

সুরেশবাবু মৃদু হেসে বললেন, "তুমি ঠিক ঠিকানা পেয়েছো। মনে হয় ঈশ্বর তোমাকে আমার দরজায় পাঠিয়েছেন। এসো, এক কাপ কফি খাও।"

মেয়েটি ইতস্তত করছিল, কিন্তু অবশেষে ভেতরে ঢুকল। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে দু’জন গল্পে মেতে উঠলেন। মেয়েটির নাম ছিল মাধবী সেন, তিনিও এক পরিযায়ী শ্রমিক, যিনি জীবনযুদ্ধে নিজের জায়গা তৈরি করতে চাইছিলেন।

সেই ভুল করে হওয়া সাক্ষাৎ তাদের জীবনে নতুন দিগন্ত খুলে দিল। মাধবীর প্রাণোচ্ছলতা সুরেশবাবুর নিঃসঙ্গ জীবনকে আলোকিত করল। কিছুদিনের মধ্যেই তারা একে অপরের প্রেমে পড়লেন এবং একদিন তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন।

এক সুখী পরিবার

সুরেশবাবুর নতুন সংসার শুরু হলো। তাদের দুটি কন্যাসন্তান জন্ম নিল, যারা বড় হয়ে নিজেদের কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হলো। যদিও সুরেশবাবু সুখী ছিলেন, কিন্তু হৃদয়ের এক কোণে সবসময় তার অতীতের স্মৃতি রয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে তিনি চুপচাপ বসে থাকতেন, পুরনো দিনের কথা ভাবতেন।

আমি অবাক হয়ে অনন্তবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, "তারপর কি তিনি কখনও ভারতে ফেরার কথা ভেবেছিলেন?"

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, "হ্যাঁ, অনেকবার ভেবেছিলেন। কিন্তু যখন সত্যিই যাওয়ার সুযোগ এল, তখন আর শক্তি ছিল না। তিনি বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, শরীর সঙ্গ দিচ্ছিল না। শেষ জীবনে শুধু নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। মাঝে মাঝে তারা তার পুরনো গল্প শুনতে চাইত, আর তিনি স্মৃতিচারণ করতেন।"

বিদায়ের মুহূর্ত

আমি অনন্তবাবুর সঙ্গে আরও কয়েকদিন কাটালাম, তিনি আমাকে রিওর বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখালেন। তার আতিথেয়তায় আমি মুগ্ধ হলাম। বিদায়ের দিন, তিনি আমার হাত ধরে বললেন,
— "তোমার সঙ্গে এই সাক্ষাৎ আমার জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। একদিন তুমি যদি আবার দেখা করতে আসো, তাহলে যেন মনে রাখো— আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব।"

আমি বললাম, "একদিন আপনাকে আমি ভারতেও আমন্ত্রণ জানাবো। এই গল্পের পরিণতি ওখানেই হবে।"

এই সফর আমার মনে চিরকাল রয়ে গেল। অনন্তবাবুর কাহিনি, সুরেশবাবুর জীবনসংগ্রাম ও মাধবীর অকৃত্রিম ভালোবাসার গল্প আমাকে ভাবিয়ে তুলল। সত্যিই, ভালোবাসা কখনও হারিয়ে যায় না, শুধু নতুন রূপে ফিরে আসে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দুপুরের ভালবাসা

  অফিসের ব্যস্ত পরিবেশের মধ্যেও দীপকের দিকে তাকালে হৃদয়ের গভীরে এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করত সায়নার। কয়েক সপ্তাহ হলো তাদের বন্ধুত্ব একটু ভিন্ন মোড় নিয়েছে, কিন্তু সায়না জানে—এই সম্পর্ক তার জীবনকে বদলে দেবে চিরদিনের জন্য। সবকিছু শুরু হয়েছিল এক দুপুরের বিরতিতে। দীপক সায়নাকে বলল, "চলো, ব্যাংকে যেতে হবে, তুমি সঙ্গ দেবে?" সায়না কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেল। দীপকের গাড়িতে উঠতেই সে অনুভব করল এক অদ্ভুত উত্তেজনা, এক মিষ্টি টান। অফিসে ব্যস্ততার কারণে সারাদিন ওদের মধ্যে খুব কম কথাই হয়, তাই দীপকের সঙ্গে একান্তে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে ওর মন আনন্দে নেচে উঠল। ড্রাইভের সময় দীপকের দৃঢ় হাতে স্টিয়ারিং চাকা ধরার ভঙ্গিটা সায়নার মনে একরকম শিহরণ জাগাল। ওর মনের মাঝে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করছিল। গাড়িতে বসে সে দীপকের দিকেই তাকিয়ে রইল। দীপক ব্যাংকে কাজ সেরে যখন ফিরে এল, তখন ওর হেঁটে আসার দৃশ্য দেখে সায়নার বুকের ভিতর ধকধক করতে লাগল। দীপকের সুগঠিত শরীর, চোখের সেই গভীরতা—সব মিলিয়ে ও যেন এক মোহময় মানুষ। গাড়িতে উঠে দীপক একঝলক তাকিয়েই বুঝতে পারল সায়নার মনের অবস্থা। — "কী হলো? চুপ করে আছো কেন?...

অন্তহীন তৃষ্ণা: হৃদয়ের এক অবাধ্য উপাখ্যান

সূচনা: বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা ঢাকা শহরের ধুলোবালি আর ব্যস্ততার মাঝেও কিছু মুহূর্ত আসে যা জীবনকে আমূল বদলে দেয়। নীলার জীবনে হেনরি (সায়েম) ছিল সেই কালবৈশাখী ঝড়ের মতো—অপ্রত্যাশিত কিন্তু অনিবার্য। তাদের পরিচয়ের পর থেকে গত তিন মাসে নীলা এক অন্য জগতে বাস করছে। সায়েমকে দেখার পর থেকে তার ভেতরে এমন এক সুপ্ত কামনার জন্ম হয়েছে, যা সে আগে কখনও অনুভব করেনি। গত সাত মাস কোনো পুরুষের ছোঁয়া না পাওয়া শরীরটা যেন কেবল সায়েমের অপেক্ষাতেই ছিল। নীলা জানত না সায়েমের মধ্যে কী এমন জাদুকরী শক্তি আছে, কিন্তু তার গভীর চোখের চাউনি আর গম্ভীর কণ্ঠস্বর নীলার দীর্ঘদিনের সাজানো ‘সংকল্প’ বা 'রেজোলিউশন' ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। প্রথম রাতের সেই উন্মাদনা সেদিন ছিল এক মেঘলা রাত। নীলার ড্রয়িংরুমে বসে তারা কফি খাচ্ছিল। নীলার মনে কোনো অভিসন্ধি ছিল না; সে কেবল সায়েমের সান্নিধ্য চেয়েছিল। কিন্তু সায়েম যখন কাছে এসে নীলার কপালে আলতো করে চুমু খেল এবং খুব ধীর স্বরে কথা বলতে শুরু করল, নীলা যেন সম্মোহিত হয়ে গেল। সায়েমের পুরুষালি সুবাসে নীলা মাতাল হয়ে যাচ্ছিল। নীলা নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু সায়েমের হাতের ছোঁয়া যখন তার ...

रंग, प्रेम और कला: एक अधूरी दास्तान | Hindi Romantic Story for Artists

कला एक ऐसी भाषा है जिसकी कोई सीमा नहीं होती। यह भावनाओं को, छुअन को और रंगों को एक ऐसे कैनवास पर उकेरती है जो शब्दों से परे होता है। भारत जैसे देश में, जहाँ कला और संस्कृति की जड़ें बहुत गहरी हैं, प्रेम को अक्सर एक आध्यात्मिक और दिव्य रूप में देखा गया है। लेकिन कभी-कभी, दो अलग-अलग पीढ़ियों, दो अलग-अलग दृष्टिकोणों के बीच का प्रेम भी रंगों की तरह आपस में घुल-मिल जाता है। यह कहानी है एक ऐसे चित्रकार की, जिसकी उम्र के इस पड़ाव पर कला ही उसका सब कुछ थी, और एक ऐसी युवा लड़की की जो रंगों की दुनिया में अपनी पहचान बनाना चाहती थी। पहला अध्याय: कला की दुनिया और मुलाकात मैं लगभग पैंतीस साल का हूँ और बारह साल की उम्र से कला और रंगों की दुनिया में डूबा हुआ हूँ। मेरी आँखों ने रंगों के अनगिनत शेड्स देखे हैं, लेकिन जब आप एक ऐसे शहर में रहते हैं जहाँ युवा और ऊर्जावान छात्र-छात्राएं कला सीखने आते हैं, तो जीवन का नजरिया थोड़ा बदल जाता है। यहाँ एक प्रसिद्ध कला महाविद्यालय है, जहाँ के छात्रों के पास अभी सीखने के लिए बहुत कुछ है। लेकिन हर नए सेमेस्टर के साथ, जीवन में कुछ नई ऊर्जा, कुछ नए रंग और कुछ ताज़गी जर...