
আমি একজন সাংবাদিক, আমার কাজ হলো বিভিন্ন দেশ ঘুরে সেখানকার সংস্কৃতি, ইতিহাস, এবং মানুষের গল্প তুলে আনা। এই কাজে আমি আনন্দ পাই, কারণ প্রতিটি দেশে এমন কিছু পাওয়া যায় যা আমার জীবনকে সমৃদ্ধ করে। এবার আমার যাত্রা বাংলাদেশে, যেখানে আমি এই দেশের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পাই। কিন্তু আমি ভাবতেও পারিনি, এই সফরটি শুধু একটি সাধারণ প্রতিবেদন তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—এটি পরিণত হবে এক গভীর, আবেগপূর্ণ ব্যক্তিগত যাত্রায়।
একটি আকস্মিক সাক্ষাৎ
কক্সবাজারের এক ব্যস্ত শপিং মলে আমি হঠাৎ করেই পরিচিত হই অরুণ এবং মুক্তা নামের এক দম্পতির সঙ্গে। তারা ইহুদি, কিন্তু তাদের শিকড় ভারতের শিলিগুড়িতে। অনেক বছর আগে তারা বাংলাদেশে চলে এসেছিলেন এবং এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন।
আমাদের মধ্যে সংযোগ তৈরি হলো খুব দ্রুত। আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম, যেন বহু বছর পরে হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। মুক্তার চোখে জল দেখা গেল, আর অরুণ বিস্ময়ের সঙ্গে আমার হাত ধরে বললেন, "আপনি শিলিগুড়ি থেকে এসেছেন? আমাদের জন্মভূমির কেউ এখানে, আমাদের সামনে!"
এই আকস্মিক সাক্ষাৎ আমাদের বন্ধুত্বের সূচনা করল।
দাউদের গল্প
অরুণ এবং মুক্তার একমাত্র সন্তান দাউদ, যে তাদের দত্তক নেওয়া ছেলে। সে জন্মেছিল ভারতে, কিন্তু তার শিকড় সম্পর্কে কিছুই জানত না।
আমি যখন তাদের বাড়িতে গেলাম, তখন দাউদ আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল। তার বয়স ত্রিশের কাছাকাছি, সুদর্শন, আত্মবিশ্বাসী, এবং ব্যাবসায়িক মনোভাবসম্পন্ন একজন যুবক। সে তার বাবার ব্যবসা দেখাশোনা করত, পাশাপাশি কৃষি নিয়ে গবেষণা করত।
দাউদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে দেরি হলো না। সে ভারত সম্পর্কে জানতে চাইল, বিশেষ করে শিলিগুড়ি সম্পর্কে। আমি ওকে বললাম, শিলিগুড়ির চা-বাগান, পাহাড়ি আবহাওয়া, মালবাজারের স্নিগ্ধ প্রকৃতি, আর বাগডোগরার ব্যস্ততা সম্পর্কে। দাউদের চোখে কৌতূহল ঝলসে উঠল।
"আমি কি কখনো শিলিগুড়ি যাবো?" দাউদ একদিন প্রশ্ন করল।
আমি হাসলাম, "শুধু যাবে না, তোমার শিকড়ের টান যে তোমাকে সেখানেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, সেটা তুমি টের পাবে!"
ফিরতি যাত্রা: শিকড়ের টান
দাউদ অবশেষে ভারত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আমি তাকে যথাযথ সংস্থার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম, যেখানে সে তার কৃষি ব্যবসার সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে।
যখন সে শিলিগুড়ি পৌঁছালো, তখন যেন তার ভেতর নতুন এক অনুভূতির জন্ম নিল। হিমালয়ের হাওয়ার স্পর্শ, পুরনো রাস্তাগুলোতে হাঁটা, মানুষের আন্তরিকতা—সবকিছু যেন তার জন্য চিরপরিচিত হয়ে উঠল।
"এ শহর আমার এত আপন লাগছে কেন?" দাউদ নিজেকেই প্রশ্ন করল।
এই সফরটি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। এখানে এসে সে ফারিহা নামের এক ভারতীয় মেয়ের প্রেমে পড়ল।
ফারিহার আবির্ভাব
ফারিহা একজন কৃষি গবেষক, যে শিলিগুড়ির চা-বাগান ও জৈব কৃষি উন্নয়নের জন্য কাজ করছিল। তার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল একটি সেমিনারে, যেখানে দাউদ বাংলাদেশের কৃষি প্রযুক্তি নিয়ে বক্তব্য রাখছিল।
ফারিহার সঙ্গে পরিচয়ের পর দাউদের মধ্যে নতুন পরিবর্তন আসতে লাগল।
সে তার সঙ্গে অনেক সময় কাটাতে শুরু করল। তাদের কথোপকথন প্রথমে কৃষি নিয়ে ছিল, তারপর ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত জীবনের দিকেও গড়াল।
একদিন দাউদ ফারিহাকে বলল, "তুমি জানো, আমি কোথা থেকে এসেছি, সেটা আমি নিজেও জানতাম না। কিন্তু এখানে এসে মনে হচ্ছে, আমি আমার হারিয়ে যাওয়া বাড়িতে ফিরে এসেছি।"
ফারিহা হাসল, "তাহলে হয়তো শেকড় তোমাকে এখানে ফিরিয়ে এনেছে।"
সেই হাসিতে দাউদ যেন তার ভবিষ্যতের ছবি দেখতে পেল।
সত্যের প্রকাশ
ফারিহার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হওয়ার পর, দাউদ সিদ্ধান্ত নিল, সে তার বাবা-মায়ের কাছে যাবে এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা করবে।
কিন্তু তখনই তার সামনে উঠে এলো এক চমকপ্রদ সত্য।
তার বাবা-মা যখন শুনলেন যে দাউদ ভারতের এক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ছে, তখন তারা মনে করলেন যে এখনই সঠিক সময় তাকে তার আসল পরিচয় জানানো।
অরুণ গভীর দৃষ্টিতে দাউদের দিকে তাকালেন, "ছেলে, তোমার শেকড় নিয়ে তুমি যে কৌতূহলী ছিলে, আজ আমরা তোমাকে সেই সত্য বলব। তুমি আসলে আমাদের নিজের সন্তান নও, তোমাকে আমরা দত্তক নিয়েছিলাম শিলিগুড়ি থেকে।"
এক মুহূর্তের জন্য, দাউদ বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।
তার শিরা-উপশিরায় এক নতুন অনুভূতি বয়ে গেল।
"তাহলে আমি... ভারতীয়?"
মুক্তা কেঁদে ফেললেন, "তুমি আমাদের সন্তান, সেটা কখনো বদলাবে না। কিন্তু হ্যাঁ, তোমার শিকড় এই মাটিতেই।"
ভালোবাসার পরিণতি
দাউদ তার সত্যিটা গ্রহণ করল, আর বুঝতে পারল কেন সে শিলিগুড়িকে এত আপন মনে করছিল।
সে ফারিহাকে বলল, "আমি শুধু এখানে বেড়াতে আসিনি, আমি এখানে ফিরে এসেছি।"
ফারিহা তাকে বলল, "তাহলে এবার আমাদের গল্পটা সম্পূর্ণ করি।"
এক বছর পর, দাউদ আবার এল শিলিগুড়িতে—এবার ফারিহার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে।
তার বাবা-মা বাংলাদেশ থেকে এলেন, আর পুরো অনুষ্ঠান হলো বাঙালি ঐতিহ্যে।
বিয়ের পর দাউদ বলল, "আমি আমার পরিচয়ের সন্ধানে বেরিয়েছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুঝলাম—পরিচয় কোথাও লুকিয়ে থাকে না, সেটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেই প্রকাশ পায়।"
শেষ কথা
একজন মানুষ তার শিকড় কখনো ভুলে যেতে পারে না। দাউদের মতো অনেক মানুষ হয়তো তাদের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে জানে না, কিন্তু যখন সময় আসে, শেকড় নিজেই তাদের কাছে ফিরে আসে।
ভালোবাসা, আত্ম-অনুসন্ধান এবং শিকড়ের টানে, দাউদ তার সত্যিকারের বাড়ি খুঁজে পেল—একটি দেশ, একটি পরিবার, এবং একজন সঙ্গী, যার সঙ্গে সে তার নতুন জীবন শুরু করল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন