
সৌদি আরব, এই দূরদেশ, অচেনা অতিথির জন্য সবসময়ই একটি চ্যালেঞ্জের বিষয়। আমার এক সরকারি সফরের সময়, সৌদি আরবে বসবাসরত আমার কিছু ব্যক্তিগত বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়, বিশেষ করে রিয়াদ ও জেদ্দায়। সেই সময়ে আমার এক পুরনো বন্ধু, অনির্বাণ সেনের সঙ্গে আমার দেখা হয়। আমরা একই স্কুলে পড়তাম, কিন্তু সে এখন সৌদি আরবে বসবাস করছে।
অনির্বাণ কলকাতার ছেলে, তবে তার স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা পশ্চিমবঙ্গের এক ছোট শহর কৃষ্ণনগরের মেয়ে। ওরা বহু বছর আগে সৌদি আরবে চলে আসে, যেখানে অনির্বাণ একটি বড় নির্মাণ সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মী হিসেবে কাজ করে। ওদের ছোট মেয়ে, তৃষা, প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। প্রতি গ্রীষ্মে প্রিয়াঙ্কা ও তৃষা কলকাতায় শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে যায়।
আমি সৌদি আরবে এসে হোটেল থেকে অনির্বাণকে ফোন করতেই ও অবাক হয়ে যায়। অনেকদিন পর আমাদের দেখা হবে জেনে ও খুব খুশি হয়। ওর কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও একদিন ছুটি নিয়ে আমার সঙ্গে কাটানোর পরিকল্পনা করে।
আমরা পরদিন সকালে হোটেলের রেস্তোরাঁয় দেখা করি, আর ও আমাকে একটি ঘটনা শোনায়, যা ওর জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর ও ভুলতে না পারা অভিজ্ঞতা।
এক ভুল সিদ্ধান্ত
সেই ঘটনা ঘটে জুলাই মাসের এক সন্ধ্যায়, যখন প্রিয়াঙ্কা ও তৃষা কলকাতায় ছিল। অফিসের বোর্ড মিটিং শেষ করে অনির্বাণ রিয়াদের এক বিলাসবহুল ক্যাফেতে ঢোকে। ক্লান্ত শরীরে এক কাপ কফি নিয়ে বসতেই, হঠাৎ এক সুন্দরী ভারতীয় তরুণী ওর পাশে এসে দাঁড়ায়। মেয়েটির নাম ছিল মেহের।
সৌজন্যতাবশত অনির্বাণ তার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে। মেহের খুব সহজেই ওর সঙ্গে কথা বলা শুরু করে, যেন ওরা অনেকদিনের পরিচিত। অনির্বাণ সাধারণত তার পরিবার ছাড়া অন্য কোনো নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করত না, কারণ তার স্ত্রী ও কন্যাই ছিল তার জীবনের সর্বস্ব। কিন্তু সেদিন পরিস্থিতি এমন হয়ে যায় যে, ও নিজেকে আটকে রাখতে পারে না।
ওদের আলাপ দীর্ঘ হয়, তারপর মেহের ওকে তার ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়। সেখানে ওরা একে অপরের প্রেমে বিভোর হয়ে যায়। সময়ের হিসেব না করেই ওরা একসঙ্গে রাত কাটিয়ে দেয়। তবে সেই মুহূর্তে অনির্বাণ বুঝতে পারেনি, এই সম্পর্ক তার জন্য কতটা বিপজ্জনক হতে পারে।
পরদিন সকালে মেহের তাকে আশ্বস্ত করে যে, এই সম্পর্ক তার পারিবারিক জীবনে কোনো সমস্যা তৈরি করবে না। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ভয়ংকর পরিণতি
প্রিয়াঙ্কা ও তৃষা কলকাতা থেকে ফেরার পর অনির্বাণ তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। তবে সে বুঝতে পারছিল, কিছু একটা ভুল হয়ে গেছে। মেহের একদিনের জন্যও ওকে ভুলতে পারেনি। সে নিয়মিত ফোন করতে থাকে, প্রথমে অফিসে, তারপর বাড়িতে।
যতই অনির্বাণ তাকে এড়িয়ে যেতে চায়, মেহের ততটাই ওর জীবনে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। একদিন, সে অনির্বাণের অফিসে এসে হট্টগোল সৃষ্টি করে।
এরপর আরও ভয়ংকর কিছু ঘটে। অনির্বাণ সিদ্ধান্ত নেয় যে, সে নতুন অ্যাপার্টমেন্টে চলে যাবে। কিন্তু মেহের খবর পেয়ে যায় এবং একদিন হঠাৎ করেই প্রিয়াঙ্কার সামনে হাজির হয়। সে নিজেকে একজন ভাড়াটে হিসেবে পরিচয় দেয়, যে অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিতে চায়।
অনির্বাণ বাড়ি ফিরে দেখে, মেহের সেখানে বসে আছে! তবে সে কিছু বোঝার আগেই স্বাভাবিক আচরণ করে, যাতে প্রিয়াঙ্কা কোনো সন্দেহ না করে।
কিন্তু মেহের এখানেই থামেনি। সে অনির্বাণকে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। একদিন অনির্বাণের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর, তার মেয়ে তৃষা স্কুলে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে ফেলে। এসব ঘটনায় প্রিয়াঙ্কা প্রচণ্ড মানসিক চাপে পড়ে যায় এবং একদিন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।
অনির্বাণ তখন পুলিশকে জানায়। কিন্তু তারা উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যবস্থা নিতে অস্বীকার করে।
নতুন সূচনা
কিছুদিন পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হয়। অনির্বাণ তার স্ত্রীর পাশে ফিরে আসে, তাদের মেয়েও সুস্থ হয়ে ওঠে।
সেই মুহূর্তে, অনির্বাণ উপলব্ধি করে যে, তার আসল সুখ তার স্ত্রী ও কন্যার সঙ্গেই। সে প্রিয়াঙ্কার কাছে ক্ষমা চায় এবং তার সঙ্গে নতুন করে জীবন শুরু করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
এভাবে তাদের সম্পর্ক আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। অনির্বাণ বুঝতে পারে, সামান্য একটি ভুল কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তবে ভালোবাসা এবং বিশ্বাস থাকলে সবকিছু আবার ঠিক হয়ে যায়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন