
সুদীর্ঘ কর্মসূত্রে তুরস্কে থাকার পর আমার পরবর্তী গন্তব্য ছিল ভারত—এক ঐতিহাসিক এবং সমৃদ্ধশালী দেশ। এখানে আসার মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসায়িক কাজ, তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি আরও একটি বিশেষ কারণে উত্তেজিত ছিলাম। আমি জানতে চেয়েছিলাম এখানে থাকা আমার এক পুরনো বন্ধু অরিন্দমের গল্প, যার জীবন এক অবাক করা ভালোবাসার অধ্যায়ে মোড় নিয়েছে।
আমাদের দেখা হওয়ার পরিকল্পনা আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। আমরা দেখা করলাম কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে। শেষবার আমরা যখন দেখা করেছিলাম, তখন তিনি মুম্বাই-তে কর্মরত ছিলেন এবং সেখান থেকে ব্যবসায়িক কাজে চেন্নাই এসেছিলেন। কিন্তু সেই সফরই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সেখানে তিনি লায়লা নামের এক সুন্দরী তরুণীর প্রেমে পড়েন, যে ছিল একটি বড় ব্যবসায়ী সংস্থার ব্যক্তিগত সচিব।
লায়লার পরিবার ছিল খ্রিস্টান ক্যাথলিক, তাই তাদের প্রেম নিয়ে পরিবারের কোনো আপত্তি ছিল না। তবে অরিন্দমের বাড়ির লোকজন, বিশেষ করে তার বাবা-মা, ছেলের বিদেশে থাকা ও অন্য সংস্কৃতির মেয়েকে বিয়ে করার ব্যাপারে কিছুটা সংশয়ী ছিলেন।
ভালোবাসার পথে বাধা
অরিন্দম প্রথমে ভেবেছিল, সে লায়লাকে বিয়ে করে কলকাতায় ফিরে আসবে। কিন্তু যখন সে তার বসকে এই কথা জানায়, তখন তিনি আপত্তি জানান। তিনি বললেন, "আমি লায়লাকে আমার ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখি, কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবন তার নিজের ব্যাপার।"
তবে, যখন অরিন্দম জানায় যে সে লায়লাকে বিয়ে করে কলকাতায় নিয়ে যাবে, তখন লায়লার বস সরাসরি নিষেধ করেন। পরিবর্তে তিনি প্রস্তাব দেন, "তুমি চাইলে এখানে থেকে কাজ করতে পারো এবং লায়লার সঙ্গে সংসার করতে পারো।"
এই কথাগুলো শোনার পর অরিন্দম তার সমস্ত পরিকল্পনা নতুনভাবে ভাবতে শুরু করল। একদিকে কলকাতায় তার পরিবারের টান, অন্যদিকে লায়লার প্রতি গভীর ভালোবাসা। শেষ পর্যন্ত, সে সিদ্ধান্ত নিল চেন্নাইতে থেকে যাওয়ার। তার জন্য এটি সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না, কারণ তার বাবা-মা এই সম্পর্কের বিরোধিতা করছিলেন।
অরিন্দম যখন তার বাবা-মাকে জানাল যে সে চেন্নাইতেই থেকে যাবে, তখন তারা অত্যন্ত কষ্ট পেলেন এবং তার বিয়েতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে লায়লা ছিল তার পাশে, তার প্রতিটি কষ্টে সান্ত্বনা দিয়ে গিয়েছিল।
নতুন জীবনের শুরু
অরিন্দমের ব্যবসায়িক পার্টনার, যিনি লায়লার বসও ছিলেন, তাদের নতুন জীবনের জন্য একটি সুন্দর উপহার দিলেন—একটি ছোট্ট বাড়ি চেন্নাই শহরের কাছেই। সেই বাড়িতেই শুরু হলো তাদের নতুন দাম্পত্য জীবন।
বিয়ের পর তারা মধুচন্দ্রিমার জন্য কোডাইকানাল এবং কেরালার ব্যাকওয়াটারসে ঘুরতে গেলেন। এই সফরে লায়লা প্রথমবারের মতো দেখল দক্ষিণ ভারতের প্রকৃতির রূপ। "এ যেন এক স্বর্গোদ্যান," সে মুগ্ধ হয়ে বলল।
এরপর তারা কলকাতা যাওয়ার পরিকল্পনা করল, যদিও লায়লার পরিবার বিষয়টি গোপন রাখল যাতে অরিন্দমের বাবা-মা চিন্তা না করেন। কলকাতার সৌন্দর্যে লায়লা এতটাই মুগ্ধ হলো যে সে বলল, "এ যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব সৃষ্টি।"
পরিবারের মিলন
সময় গড়িয়ে গেল, অরিন্দম আর লায়লার সংসারে এক ফুটফুটে ছেলে এল। তার নাম রাখা হলো অর্ঘ্য। কিন্তু এই নতুন জীবনে একটা বড় অভাব ছিল—অর্ঘ্যের ঠাকুরদা-ঠাকুমা তাকে দেখতে চাননি।
বছর কয়েক পর, অর্ঘ্যের ঠাকুরদা-ঠাকুমার মনে ছেলের প্রতি অভিমান ধীরে ধীরে কমতে লাগল। একদিন, তারা চিঠি পাঠিয়ে জানালেন, "আমাদের নাতিকে আমরা দেখতে চাই। সে যখন ইচ্ছে, কলকাতায় আসতে পারে।"
এই আহ্বান অরিন্দমের জন্য খুব আবেগঘন ছিল। অবশেষে, একদিন লায়লা তাদের ছেলেকে নিয়ে কলকাতায় পাঠালেন তার ঠাকুরদা-ঠাকুমার কাছে।
অর্ঘ্য যখন কলকাতায় পৌঁছাল, তখন তার ঠাকুরদা-ঠাকুমা তাকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। এত বছর পর যেন সমস্ত অভিমান গলে গেল। তারা নাতিকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "তুই আমাদের জীবনের আলো।"
সেই সফর ছিল অর্ঘ্যের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় সময়। সে কলকাতার সমস্ত ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখল, তার ঠাকুরদার সঙ্গে নদীর ধারে বসে গল্প করল, আর ঠাকুমার হাতের রান্না খেল।
যখন সে ফিরে এল চেন্নাইতে, তার চোখ আনন্দে ঝলমল করছিল। সে তার বন্ধুদের বলল, "কলকাতা আমার দাদু-দিদার শহর। আমি ওখানে আবার যাব!"
এই গল্পটা শুধু একটি প্রেমের কাহিনি নয়, এটি দুটি সংস্কৃতির মিলন, দুটি ভিন্ন শহরের মধ্যে এক সেতুবন্ধন, আর সবচেয়ে বড় কথা—একটি পরিবারের হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের পুনর্মিলন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন