
আমার পুরনো বন্ধু দেবাশীষ, যিনি দীর্ঘ দশ বছর ধরে আমেরিকায় বসবাস করছেন, আমাকে এই গল্পটি শুনিয়েছিলেন। সরকারি কাজে ভারত ও আমেরিকা সফরের সময়, আমি বহুবার তার অতিথি হয়েছি। আমরা একসাথে নানা অনুষ্ঠান ও সভায় যোগ দিয়েছি, কিন্তু এবারের সাক্ষাৎ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কলকাতার এক ব্যস্ত রাস্তায়, হঠাৎ করেই আমাদের দেখা হয়ে গেল। প্রথমে আমরা শহরের মিউনিসিপ্যাল অফিসে কিছু কাজ শেষ করলাম, তারপর একটি রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসলাম। সেখানেই তিনি আমাকে তার জীবনের এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার কথা বললেন—একটি গল্প, যা শুনলে বিস্ময়ে মন ভরে যায়।
দশ বছর পর দেখা হওয়ার আনন্দে, আমরা পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ করতে থাকলাম। বিশেষ করে ছয় বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা তাকে আজও নাড়া দিয়ে যায়। তখন তিনি কলকাতায় এসেছিলেন কয়েক দিনের জন্য। একদিন, পাশের বাড়ির এক পরিচিত ব্যক্তি তাকে আমন্ত্রণ জানালেন কফি খেতে। ভারতে প্রবাসী বাঙালিদের জন্য এ ধরনের আমন্ত্রণ এক বিশাল আনন্দের উপলক্ষ্য। তাই দেবাশীষ সানন্দে সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন।
প্রথম দেখা, প্রথম প্রেম
দেবাশীষ দরজায় পা রাখতেই তার চোখ পড়ল এক অপূর্ব রূপবতী তরুণীর দিকে। যেন কোথা থেকে সে উড়ে এলো! মিষ্টি হেসে সে তাকে ভেতরে আমন্ত্রণ জানাল, যদিও তার বাংলা উচ্চারণ ছিল খানিকটা ভাঙা। অতিথি ঘরে প্রবেশ করার পর, তার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো—“এলি, আমাদের ভাইঝি। নিউইয়র্কে জন্ম ও বেড়ে ওঠা, তবে এবার দেশে এসেছে ভালো পাত্র খুঁজতে।”
অল্প সময়ের মধ্যেই দেবাশীষ বুঝতে পারলেন, এই দেখা একেবারেই আকস্মিক নয়। এটি একটি পরিকল্পিত আয়োজন, যেখানে তিনিই মূল চরিত্র। তার প্রতিবেশী এবং তার স্ত্রী রাধা চেয়েছিলেন দেবাশীষ ও এলি একে অপরকে জানার সুযোগ পাক। প্রথম দেখাতেই তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে ওঠে, এবং ধীরে ধীরে একসাথে সময় কাটানোর সুযোগ বাড়তে থাকে।
এরপর শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। প্রতিদিন তাদের দেখা হতে লাগল। কখনো রেস্তোরাঁয়, কখনো শপিং মলে, কখনো শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে তারা একসঙ্গে সময় কাটাতেন। এমনকি প্রতিবেশীর উৎসাহে তারা একসঙ্গে ঘুরতে গেলেন দার্জিলিং পর্যন্ত। এলির পরিবারের সদস্যরাও তাদের সম্পর্কে বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন এবং আমেরিকায় এক জাঁকজমকপূর্ণ বিবাহের প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন।
দ্বিধার দ্বন্দ্ব
কিন্তু দেবাশীষের মন যেন বারবার একটি জায়গায় গিয়ে আটকে যাচ্ছিল। তিনি কলকাতায় এসেছিলেন মূলত তার দীর্ঘদিনের প্রেমিকা রূপসীর সাথে বিয়ের কথা পাকাপাকি করতে। তিন বছর ধরে তাদের সম্পর্ক ছিল, এবং তারা দু’জনই ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখছিলেন। তবে এলির প্রতি আকর্ষণ তাকে এক নতুন সংকটে ফেলে দিল।
নিজের মনকে বুঝিয়ে, সে সিদ্ধান্ত নিল—বিয়েটা একটু পিছিয়ে দেওয়া হোক। তাই রূপসীর সাথে কথা বলে তিনি আমেরিকায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এলির সঙ্গে। রূপসী অনেক কষ্ট পেলেও, দেবাশীষ তাকে আশ্বাস দিলেন, এই বিলম্ব শুধুই সাময়িক।
একটি ভুল সিদ্ধান্ত
নিউইয়র্কে পৌঁছে, দেবাশীষ বুঝতে পারলেন তার জীবন কতটা পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এলির মা তাদের নতুন জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করলেন। এমনকি তাদের নতুন বাড়ির ব্যবস্থা করাও হলো তার ইচ্ছামতো। শ্বশুরবাড়ির হস্তক্ষেপ ধীরে ধীরে তাদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তির জন্ম দিতে লাগল।
দেবাশীষ বুঝতে পারলেন, এলি আসলে তার মায়ের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। যখন তিনি আলাদা থাকার প্রস্তাব দিলেন, এলি কড়া আপত্তি জানাল। এখানেই দেবাশীষের চোখ খুলে গেল। তিনি উপলব্ধি করলেন, এই সম্পর্ক টিকবে না।
পালিয়ে ফেরা
একদিন, বাইরে হাঁটার নাম করে, তিনি এয়ারপোর্ট চলে গেলেন। প্রথম ফ্লাইটেই তিনি ফিরলেন কলকাতায়। সরাসরি গেলেন রূপসীর কাছে। তাকে জানালেন, সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। তিনি এখন শুধুই তার জন্য।
“কিন্তু, আমেরিকার বিয়ের নথি?”—আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
দেবাশীষ হেসে বলল, “সেটা আসলে কোনোদিনই আইনি ছিল না! কেবল একটা ভুয়া কাগজ তৈরি করেছিলাম, যা আমি আমেরিকায় থাকতেই নষ্ট করে দিয়েছি।”
নতুন জীবন, নতুন ভালোবাসা
রূপসীর সাথে তার সংসার এখন তিন বছর চলছে। তাদের কোলজুড়ে এসেছে এক ফুটফুটে কন্যা, মেঘলা। দেবাশীষ এখন কলকাতাতেই তার ব্যবসা শুরু করেছেন।
“এলি বা তার পরিবার কি তোমার খোঁজ করেছে?”
“একবার চেয়েছিল আমাকে ফেরাতে। টিকিটের ব্যবস্থা পর্যন্ত করতে চেয়েছিল। পরে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। কিন্তু আমি পাত্তা দিইনি।”
আমি হাসলাম। “তাহলে কি প্রমাণিত হলো? ভালোবাসা টাকাকে হারিয়েছে?”
দেবাশীষ বলল, “হ্যাঁ, ভালোবাসা টাকাকে হারিয়েছে। এবং আমি সত্যিই সুখী।”
শেষ কথা
জীবনের পথচলায় অনেকেই হয়তো আমাদের জীবনে আসে, কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা একবারই আসে। দেবাশীষ তার ভুল বুঝতে পেরেছিলেন এবং সময় থাকতেই নিজেকে সংশোধন করেছিলেন। তাই, প্রেমে কখনো কখনো আকর্ষণকে নয়, হৃদয়ের গভীরতাকে বিচার করাই সঠিক সিদ্ধান্ত।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন