
তাহসান পেশায় একজন ট্রাক চালক। সারা সপ্তাহ রাস্তার ধুলো-মাটির সঙ্গে পথচলা, কখনো শহরের ব্যস্ত রাস্তায়, কখনো বা গ্রামবাংলার সরু পথে। কাজের চাপে তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটে যায় দূরে দূরে, কিন্তু একটা মুহূর্ত সবসময় তার মন জুড়ে থাকে—সায়মার সাথে দেখা হওয়ার সময়।
সায়মা তাহসানের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়। লম্বা ঘন চুল, মায়াবী চোখ আর কোমল হাসিতে ও যেন এক স্বপ্নের মতো। তাহসান জানত, কাজ যতই কঠিন হোক, সায়মার অপেক্ষায় ফেরার একটা আনন্দ আছে।
একদিন, তাহসান যখন ওর ট্রিপ শেষ করে ফিরছিল, সায়মা ফোন করল।
— "তুমি কবে আসবে?"
ওর কণ্ঠে একটা উচ্ছ্বাস, একটা অভিমান। তাহসান হাসল, গাড়ির গতি একটু বাড়িয়ে দিল।
— "আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা, তারপর তোমার কাছেই থাকব!"
কিন্তু বিধি বাম। হঠাৎ একটা জরুরি ডেলিভারির জন্য তাহসানকে পরদিনও রাস্তায় থাকতে হবে। ও মন খারাপ করে সায়মাকে জানাল।
সায়মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "তাহলে আমিও তোমার সাথে যাব, কেমন?"
তাহসান প্রথমে দ্বিধা করেছিল, কিন্তু ওর মন বলছিল, এটা একটা দারুণ সুযোগ একসাথে কিছু সময় কাটানোর। অবশেষে, শুক্রবার সন্ধ্যায় যখন তাহসান লোড নেওয়ার জন্য বেরোল, পথে সায়মাকে তুলে নিল।
সফরের শুরু
সায়মা নীল রঙের একটা শাড়ি পরেছিল, সঙ্গে সাদামাটা কাজের ব্লাউজ। ওর হাসিটা যেন সন্ধ্যার আলোয় আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।
— "এই যে ট্রাক চালক সাহেব, আজ আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?" ও মজা করল।
— "তোমাকে একটা দারুণ যাত্রায় নিয়ে যাচ্ছি," তাহসান হাসল।
রাস্তায় গাড়ি চলতে থাকল। বাতাসের শীতল স্পর্শ, সায়মার গায়ের মিষ্টি সুগন্ধ, আর ওর কাঁধে ছড়িয়ে পড়া চুলের সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা স্বপ্নের মতো লাগছিল।
কিছুক্ষণ পর, সায়মা জানালার পাশে বসে বলল, "তুমি জানো, আমি সবসময় ভাবতাম ট্রাকে ভ্রমণ বোধহয় খুব ক্লান্তিকর। কিন্তু তোমার সাথে এটা বেশ রোমান্টিক মনে হচ্ছে!"
তাহসান হেসে বলল, "কারণ তুমি আমার পাশে আছো।"
ওদের গাড়ি একটা ব্রিজ পার হচ্ছিল, নিচে বয়ে চলা নদীর পানিতে চাঁদের আলো পড়ছিল। সায়মা হাত বাড়িয়ে তাহসানের হাত ধরল।
— "তুমি জানো, তোমার গায়ের গন্ধটা আমি মিস করি? যখন তুমি থাকো না, তখন তোমার শার্ট জড়িয়ে ঘুমাই।"
তাহসানের বুকটা কেমন যেন করে উঠল। ওর খুব ইচ্ছে করছিল সায়মাকে কাছে টেনে নিতে, কিন্তু গাড়ি চালানোর সময় সেটা সম্ভব নয়। তাই ও শুধু ওর আঙুল দিয়ে সায়মার হাতটা শক্ত করে ধরল।
একটু বিরতি
রাত গভীর হলে ওরা একটা ছোট খাবারের দোকানে থামল। ট্রাকচালকদের জন্য বিখ্যাত এই দোকানটা ছিল বেশ জমজমাট। সায়মা যখন নামল, ওর শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছিল। চারপাশের মানুষ তাকিয়ে ছিল, কিন্তু তাহসান জানত, সায়মার চোখের মায়ায় ও শুধু তাহসানকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে।
ডিনারের টেবিলে বসে সায়মা মিষ্টি করে হাসল।
— "এই জায়গাটা বেশ অন্যরকম। জানো, আমি ভাবতে পারিনি ট্রাক চালকদের এত সুন্দর গল্প থাকে!"
তাহসান মুচকি হেসে বলল, "গল্প তো শুধু শুরু হয়েছে, সায়মা!"
খাওয়া শেষে যখন ওরা ফিরে এলো, রাত আরও গভীর হয়ে গিয়েছিল। ট্রাকের কেবিনে আলো কমিয়ে সায়মা কাঁধে মাথা রাখল।
— "তাহসান, তুমি কি জানো, তোমার সঙ্গে থাকলে আমি অন্য কোনো কিছু চাই না?"
ওর কণ্ঠে এত গভীর ভালোবাসা ছিল যে তাহসানের বুক ধক করে উঠল। ও সায়মার চুলে হাত বুলিয়ে বলল, "তাহলে তো আমাকে সবসময় তোমার পাশে থাকতে হবে!"
সায়মা হাসল, চোখ বন্ধ করল। তাহসান জানত, এই মুহূর্তটাই একসাথে থাকার আসল সৌন্দর্য।
ভোরের প্রেম
ভোরের দিকে, যখন রাস্তার কুয়াশা কমতে শুরু করেছিল, তাহসান সায়মাকে বলল, "তুমি কি জানো, এই সফরটা আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সফর?"
সায়মা তাকিয়ে বলল, "আরো কত সুন্দর সফর বাকি আছে, জানো?"
তাহসান ওর কপালে আলতো করে চুমু দিল। ট্রাক এগিয়ে চলল, আর তাদের ভালোবাসার গল্পটা এক নতুন পথে যাত্রা করল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন