সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নিয়তির মোড়

niyotir more

 

জীবন নিজেই তার উপন্যাস লিখে চলে। এমনই এক অদ্ভুত কাহিনি গড়ে উঠেছিল অরিন্দমের জীবনে, যাকে আমি প্রথমবার টরন্টোতে থাকার সময় দেখেছিলাম। ভারতীয় অভিবাসীদের জীবন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তার সঙ্গে পরিচয় হয়।

এক সন্ধ্যায়, আমরা এক ভারতীয় মালিকানাধীন রেস্তোরাঁয় বসেছিলাম। সেই সময় অরিন্দম আমাকে বলল, কীভাবে সে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছিল—এ যেন এক অলৌকিক ঘটনা!

প্রেমের শুরু

অরিন্দম পশ্চিমবঙ্গের এক ছোট্ট শহর দুর্গাপুরে বড় হয়েছিল। সে ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখত বিদেশে গিয়ে নিজের জীবন গড়ার। তার এই স্বপ্ন সত্যি হয় যখন সে স্থায়ীভাবে কানাডায় বসবাসের সুযোগ পায়।

বিদেশে যাওয়ার কিছুদিন আগে সে প্রথমবার দেখেছিল সুনয়নাকে। দুর্গাপুরের এক ডিস্কোথেকে তার সঙ্গে পরিচয় হয়। সুনয়না ছিল আশেপাশের অঞ্চলের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েদের একজন। তার মায়াবী চোখ আর আকর্ষণীয় হাসি দেখে অরিন্দম ঠিক করে, যেভাবেই হোক তাকে বিয়ে করবেই!

সুনয়নাও অরিন্দমকে অপছন্দ করত না। তবে যখন সে জানতে পারে, অরিন্দম কানাডা যাচ্ছে, তখন সে আরও আগ্রহী হয়ে ওঠে। একটা ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে সে অরিন্দমের প্রেমপ্রস্তাব গ্রহণ করে।

বিয়ের পর তারা কানাডার টরন্টো শহরে পাড়ি জমায়। সেখানে পৌঁছানোর পর অরিন্দমের এক বন্ধু তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেয় এবং দ্রুতই একটি চাকরির ব্যবস্থা করে ফেলে। সে স্থানীয় এক অটো-গ্যারেজে কাজ শুরু করে।

প্রথম কয়েক বছর সুনয়না চাকরি করেনি। তাদের সংসার সুখের ছিল, কিন্তু বড় একটি ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গিয়েছিল—সন্তান। বছর কেটে যাচ্ছিল, কিন্তু তারা বাবা-মা হতে পারছিল না। এই হতাশা ধীরে ধীরে তাদের জীবনে বিষাদ এনে দিল।

বিশ্বাসঘাতকতার শুরু

সুনয়না সন্তানহীনতার কষ্টে একা হয়ে পড়ছিল। এই সময় তাদের প্রতিবেশী, অজিত, তাকে সান্ত্বনা দিতে শুরু করে। অজিত একজন ভারতীয় অভিবাসী ছিল, যে সুনয়নাকে মনে মনে পছন্দ করত। ধীরে ধীরে সুনয়নারও একাকিত্ব দূর করতে সে অজিতের কাছে টান অনুভব করতে লাগল।

একসময় তাদের সম্পর্ক শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় পৌঁছে যায়। তারা খুব সাবধানে মিলিত হত, কিন্তু অরিন্দমের মতো চতুর মানুষের নজর এড়ানো সম্ভব ছিল না।

পরিকল্পিত প্রতিশোধ

অরিন্দম বুঝতে পারে, তার স্ত্রী তাকে প্রতারিত করছে। কিন্তু সে সরাসরি কিছু বলল না। বরং সে এক চতুর পরিকল্পনা করল।

একদিন সে সুনয়নাকে জানাল, সে অন্য শহরে কাজের জন্য দুই দিন থাকবে। সে বাড়িতে থাকবে না শুনে সুনয়না একটু মন খারাপ করার ভান করল, কিন্তু তাকে থামানোর চেষ্টা করল না।

অরিন্দম তার বন্ধুকে, তপনকে, এই রহস্য উন্মোচনের দায়িত্ব দিল। তপন সুনয়নাকে চিনত না, তাই তার পক্ষে অনুসন্ধান করা সহজ ছিল। সে অরিন্দমের বাড়ির আশপাশে পাহারা দেওয়া শুরু করল এবং সঙ্গে একটি ক্যামেরা নিয়ে এল, যাতে প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারে।

অরিন্দম শহর ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই অজিত বাড়িতে ঢুকে পড়ল। তারা একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে গেল। ঠিক তখনই তপন অরিন্দমকে ফোন করে জানাল, “তোর বাড়িতে একজন অতিথি এসেছে!”

ট্যাক্সির যাত্রী এবং পরামর্শদাত্রী

এই ফোন পেয়েই অরিন্দম তড়িঘড়ি করে একটা ট্যাক্সি ধরে বাড়ির দিকে রওনা দিল।

ট্যাক্সিতে উঠে সে খেয়াল করল, সেখানে একজন সুন্দরী নারী বসে আছে। তিনি খুব উচ্ছ্বসিত লাগছিলেন।

“আপনি এত খুশি কেন?” অরিন্দম জানতে চাইল।

“আমি পাঁচ বছর ধরে চেষ্টা করার পর অবশেষে মা হতে চলেছি!”—মেয়েটি খুশিতে জানাল।

তার কথায় অরিন্দমের বুকটা হঠাৎই মোচড় দিয়ে উঠল। কয়েক মিনিট আগেও সে শুধু প্রতিশোধের কথা ভাবছিল, কিন্তু এই নারী যেন তাকে একটা নতুন দৃষ্টিকোণ দেখাল।

অরিন্দম তার নিজের কষ্টের কথা জানাল। বলল, কীভাবে তার স্ত্রী তাকে প্রতারিত করছে।

মেয়েটি হেসে বলল, “জীবন এত ছোট, প্রতিশোধ নেওয়ার চেয়ে বেঁচে থাকাই অনেক বড় কথা। আপনি কি জানেন, মানুষ সবচেয়ে বড় ভুল তখনই করে যখন সে রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত নেয়?”

এই কথাগুলো অরিন্দমের মনে গভীর দাগ কাটল।

সত্য উদ্ঘাটন এবং ক্ষমা

অরিন্দম বাড়িতে পৌঁছে যা দেখল, তাতে তার সন্দেহ সত্যি হয়ে গেল। কিন্তু তার হাতে ছিল একটি বন্দুক। রাগে অন্ধ হয়ে সে বন্দুক তুলে ধরল, কিন্তু ঠিক তখনই তার মনে পড়ল সেই মেয়েটির কথা—“জীবন সবচেয়ে মূল্যবান!”

তার হাতের বন্দুক ধীরে ধীরে নেমে এল। সে কিছু না বলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।

ট্যাক্সি ধরে সে আবার সেই মেয়েটির খোঁজে বের হল। ভাগ্যক্রমে, একটি সিগন্যালে তার চোখ পড়ল পাশের গাড়িতে—সেই মেয়েটি বসে আছে!

এইবার সে আর সুযোগ হাতছাড়া করল না। এক লাফে তার ট্যাক্সি থেকে নেমে ওই মেয়েটির গাড়িতে উঠে পড়ল।

নিয়তির মোড়

তবে আশ্চর্যের বিষয়, সেই মেয়েটিও কাঁদছিল।

“আপনি কাঁদছেন কেন?”—অরিন্দম অবাক হয়ে জানতে চাইল।

“আমি একটু আগেই দেখলাম, আমার স্বামী আরেকজন মহিলার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম, আজ টরন্টো লেকের ধারে গিয়ে নিজেকে শেষ করে দেব,”—মেয়েটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল।

এইবার অরিন্দম হাসল।

“আপনি কি জানেন, আপনি আজ আমাকে একই ভুল করা থেকে বাঁচিয়েছেন?”

এক নতুন সূচনা

তারা দু’জন একসঙ্গে লেকের ধারে গিয়ে হাঁটতে লাগল। তারা বুঝতে পারল, হয়তো তারা একে অপরের জন্যই তৈরি।

ধীরে ধীরে তাদের বন্ধুত্ব প্রেমে পরিণত হল। কিছুদিন পর তারা একসঙ্গে থাকতে শুরু করল।

বছর কয়েক পর, তাদের সন্তান জন্ম নিল। একসময় যারা প্রতারিত হয়েছিল, তারা একে অপরের সঙ্গী হয়ে জীবনের আসল মানে খুঁজে পেল।

শেষ কথা

জীবন সবসময় আমাদের ইচ্ছামতো চলে না। কখনো কখনো তা আমাদের এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে গিয়ে আমরা নতুন করে জীবনকে বুঝতে শিখি। প্রতিশোধ নয়, ক্ষমাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

অরিন্দম ও রিয়া আজও সুখী দম্পতি হিসেবে টরন্টোতে বাস করছে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করছে। তাদের গল্প আমাদের শেখায়—ভালোবাসার থেকেও বড় কিছু আছে, আর তা হল জীবন!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দুপুরের ভালবাসা

  অফিসের ব্যস্ত পরিবেশের মধ্যেও দীপকের দিকে তাকালে হৃদয়ের গভীরে এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করত সায়নার। কয়েক সপ্তাহ হলো তাদের বন্ধুত্ব একটু ভিন্ন মোড় নিয়েছে, কিন্তু সায়না জানে—এই সম্পর্ক তার জীবনকে বদলে দেবে চিরদিনের জন্য। সবকিছু শুরু হয়েছিল এক দুপুরের বিরতিতে। দীপক সায়নাকে বলল, "চলো, ব্যাংকে যেতে হবে, তুমি সঙ্গ দেবে?" সায়না কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেল। দীপকের গাড়িতে উঠতেই সে অনুভব করল এক অদ্ভুত উত্তেজনা, এক মিষ্টি টান। অফিসে ব্যস্ততার কারণে সারাদিন ওদের মধ্যে খুব কম কথাই হয়, তাই দীপকের সঙ্গে একান্তে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে ওর মন আনন্দে নেচে উঠল। ড্রাইভের সময় দীপকের দৃঢ় হাতে স্টিয়ারিং চাকা ধরার ভঙ্গিটা সায়নার মনে একরকম শিহরণ জাগাল। ওর মনের মাঝে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করছিল। গাড়িতে বসে সে দীপকের দিকেই তাকিয়ে রইল। দীপক ব্যাংকে কাজ সেরে যখন ফিরে এল, তখন ওর হেঁটে আসার দৃশ্য দেখে সায়নার বুকের ভিতর ধকধক করতে লাগল। দীপকের সুগঠিত শরীর, চোখের সেই গভীরতা—সব মিলিয়ে ও যেন এক মোহময় মানুষ। গাড়িতে উঠে দীপক একঝলক তাকিয়েই বুঝতে পারল সায়নার মনের অবস্থা। — "কী হলো? চুপ করে আছো কেন?...

অন্তহীন তৃষ্ণা: হৃদয়ের এক অবাধ্য উপাখ্যান

সূচনা: বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা ঢাকা শহরের ধুলোবালি আর ব্যস্ততার মাঝেও কিছু মুহূর্ত আসে যা জীবনকে আমূল বদলে দেয়। নীলার জীবনে হেনরি (সায়েম) ছিল সেই কালবৈশাখী ঝড়ের মতো—অপ্রত্যাশিত কিন্তু অনিবার্য। তাদের পরিচয়ের পর থেকে গত তিন মাসে নীলা এক অন্য জগতে বাস করছে। সায়েমকে দেখার পর থেকে তার ভেতরে এমন এক সুপ্ত কামনার জন্ম হয়েছে, যা সে আগে কখনও অনুভব করেনি। গত সাত মাস কোনো পুরুষের ছোঁয়া না পাওয়া শরীরটা যেন কেবল সায়েমের অপেক্ষাতেই ছিল। নীলা জানত না সায়েমের মধ্যে কী এমন জাদুকরী শক্তি আছে, কিন্তু তার গভীর চোখের চাউনি আর গম্ভীর কণ্ঠস্বর নীলার দীর্ঘদিনের সাজানো ‘সংকল্প’ বা 'রেজোলিউশন' ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। প্রথম রাতের সেই উন্মাদনা সেদিন ছিল এক মেঘলা রাত। নীলার ড্রয়িংরুমে বসে তারা কফি খাচ্ছিল। নীলার মনে কোনো অভিসন্ধি ছিল না; সে কেবল সায়েমের সান্নিধ্য চেয়েছিল। কিন্তু সায়েম যখন কাছে এসে নীলার কপালে আলতো করে চুমু খেল এবং খুব ধীর স্বরে কথা বলতে শুরু করল, নীলা যেন সম্মোহিত হয়ে গেল। সায়েমের পুরুষালি সুবাসে নীলা মাতাল হয়ে যাচ্ছিল। নীলা নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু সায়েমের হাতের ছোঁয়া যখন তার ...

रंग, प्रेम और कला: एक अधूरी दास्तान | Hindi Romantic Story for Artists

कला एक ऐसी भाषा है जिसकी कोई सीमा नहीं होती। यह भावनाओं को, छुअन को और रंगों को एक ऐसे कैनवास पर उकेरती है जो शब्दों से परे होता है। भारत जैसे देश में, जहाँ कला और संस्कृति की जड़ें बहुत गहरी हैं, प्रेम को अक्सर एक आध्यात्मिक और दिव्य रूप में देखा गया है। लेकिन कभी-कभी, दो अलग-अलग पीढ़ियों, दो अलग-अलग दृष्टिकोणों के बीच का प्रेम भी रंगों की तरह आपस में घुल-मिल जाता है। यह कहानी है एक ऐसे चित्रकार की, जिसकी उम्र के इस पड़ाव पर कला ही उसका सब कुछ थी, और एक ऐसी युवा लड़की की जो रंगों की दुनिया में अपनी पहचान बनाना चाहती थी। पहला अध्याय: कला की दुनिया और मुलाकात मैं लगभग पैंतीस साल का हूँ और बारह साल की उम्र से कला और रंगों की दुनिया में डूबा हुआ हूँ। मेरी आँखों ने रंगों के अनगिनत शेड्स देखे हैं, लेकिन जब आप एक ऐसे शहर में रहते हैं जहाँ युवा और ऊर्जावान छात्र-छात्राएं कला सीखने आते हैं, तो जीवन का नजरिया थोड़ा बदल जाता है। यहाँ एक प्रसिद्ध कला महाविद्यालय है, जहाँ के छात्रों के पास अभी सीखने के लिए बहुत कुछ है। लेकिन हर नए सेमेस्टर के साथ, जीवन में कुछ नई ऊर्जा, कुछ नए रंग और कुछ ताज़गी जर...