আদিতি আর রোহনের বিয়ের মোটে তিন মাস হয়েছে। মাসখানেক আগেই নতুন ফ্ল্যাটে উঠেছে ওরা দিল্লির বুকে। শাহদারা মেট্রো স্টেশনের কাছেই একটা ছিমছাম অ্যাপার্টমেন্টে ওদের নতুন সংসার। এখনো সব গুছিয়ে উঠতে পারেনি। বিয়ের পর থেকেই যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল আদিতি। নতুন শহর, নতুন মানুষ, নতুন জীবন – সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি। রোহন অবশ্য দিল্লিতেই মানুষ, তাই ওর জন্য ব্যাপারটা কিছুটা সহজ। কিন্তু আদিতির জন্য সবটাই নতুন।
বিয়েটা হয়েছিল ধুমধাম করে, কলকাতার সাবেকি বাড়ির মেয়ে আদিতি। রোহন এসেছিল পাত্র দেখতে, প্রথম দেখাতেই পছন্দ। রোহনের শান্ত স্বভাব, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ আর হাসি দেখে আদিতির মনে হয়েছিল, এই মানুষটাকেই সে জীবনসঙ্গী হিসেবে চায়। আর রোহন মুগ্ধ হয়েছিল আদিতির প্রাণবন্ত স্বভাব, বুদ্ধিমত্তা আর রন্ধনশিল্পের প্রতি তার ভালোবাসা দেখে। বিয়ের পর মধুচন্দ্রিমায় গিয়েছিল ওরা হিমাচল প্রদেশে, বরফের দেশে। সেই স্মৃতিগুলো এখনো টাটকা, মনের মধ্যে লেগে আছে সেই ঠান্ডার হিমেল ছোঁয়া আর উষ্ণ ভালোবাসার পরশ।
আজ সন্ধেটা ছিল মেঘলা। বাইরে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল, মনটা কেমন যেন নরম হয়ে এসেছিল আদিতির। কাজের চাপ শেষে রোহন বাড়ি ফিরেছে একটু আগে। অফিস থেকে ফিরেই হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এসেছে। আদিতি চা বানিয়ে এনেছে দু'জনের জন্য। গরম চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দু'জনে বসেছিল সোফায়। আদিতি বলল, "শুনছো? আমি ভাবছিলাম, হানিমুনের ছবিগুলো অ্যালবাম করে ফেলি। বেশ কিছু সুন্দর ছবি আছে।"
রোহন চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল, "হ্যাঁ, ভালো বলেছ। কতদিন হয়ে গেল! চলো, দেখি কোন ছবিগুলো রাখলে ভালো হয়।"
আদিতি শোবার ঘর থেকে হানিমুনের ছবিগুলো নিয়ে এল। ওদের ফ্ল্যাটের লিভিং রুমটা বেশ বড়। একপাশে একটা লম্বা উইন্ডো, সেখান দিয়ে বাইরের বৃষ্টির আবছা আলো দেখা যাচ্ছে। অন্যপাশে টি-টেবিল, তার পাশে একটা আরামদায়ক সোফা। ওরা দু'জনে সোফায় ঘেঁষাঘেঁষি করে বসল। আদিতি হাঁটু মুড়ে বসল রোহনের দিকে তাকিয়ে, আর রোহন তার এক হাত আদিতির কাঁধে রেখে ছবিগুলো দেখছিল।
"এই দেখো, এটা কুলুর ভ্যালি থেকে তোলা," আদিতি ছবিটা দেখিয়ে বলল। "মনে আছে? কী দারুণ ঠান্ডা ছিল সেদিন! তোমার হাত ধরেছিলাম ভয়ে ভয়ে।"
রোহন হেসে আদিতির নরম হাতটা নিজের হাতের তালুতে তুলে নিল। "হ্যাঁ, মনে আছে। আর এই ছবিটা? এটা মানালিতে বরফ খেলার সময় তোলা। তুমি কেমন বাচ্চাদের মতো আনন্দে লাফিয়ে উঠছিলে!"
আদিতি কপট রাগ দেখিয়ে বলল, "ইশশ! আমি বুঝি বাচ্চা? তুমিই তো তখন আমার হাত ধরে টানছিলে বরফের মধ্যে।"
ওদের খুনসুটি চলছিল। একে একে ছবিগুলো দেখছিল ওরা। Manali-এর পথে তোলা ঝর্ণার ছবি, সিমলার পাইন গাছের সারি, রোথাং পাসে বরফাবৃত চূড়া – প্রতিটি ছবির সাথে জড়িয়ে ছিল ওদের ভালোবাসার টুকরো টুকরো মুহূর্ত। আদিতি হঠাৎ একটা ছবি দেখিয়ে বলল, "এইটা আমার খুব প্রিয়। এটা তুমি তুলেছিলে, যখন আমি বরফের উপরে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, যেন মেঘের উপরে ভেসে আছি।"
রোহন আদিতির দিকে তাকাল। তার চোখে তখন ভালোবাসার গভীর ছায়া। "তোমার চোখ দুটো তখন তারার মতো জ্বলছিল, আদিতি। ওই মুহূর্তটা আমি ভুলব না।"
কথাবার্তার মাঝেই হঠাৎ একটা অদ্ভুত শব্দ হল। প্রথমে মনে হল যেন পাশের ফ্ল্যাটে কিছু পড়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই একটা তীব্র ঝাঁকুনি দিল পুরো ফ্ল্যাটটাকে। ছবিগুলো হাত থেকে ছিটকে পড়ল আদিতির। দেওয়ালে ঝোলানো বিয়ের ছবির ফ্রেমটা সশব্দে নিচে পড়ে গেল, কাঁচ ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ফ্যানটা সশব্দে দুলে উঠল, মনে হল যেন এখুনি ছিটকে পড়বে।
আদিতি কিছু বুঝে ওঠার আগেই রোহন তাকে এক টানে নিজের দিকে টেনে নিল। "আদিতি! নিচে ঝুকো!" ওর কণ্ঠস্বরে একটা তীব্র ভয় আর দৃঢ়তা। রোহন যেন মুহূর্তেই ওর স্বাভাবিক শান্ত রূপ ছেড়ে একটা নতুন রূপে ধরা দিল। মুহূর্তের মধ্যে রোহন আদিতিকে টেনে নিয়ে এলো ডাইনিং টেবিলের নিচে। টেবিলটা কাঠের, বেশ মজবুত। রোহন আদিতিকে তার বুকের কাছে টেনে নিয়ে নিজের শরীর দিয়ে যেন আড়াল করে রাখল।
বাইরে তখন প্রলয় নাচছে। মেঝের নিচে থেকে একটা বিকট গর্জন উঠে এল, মনে হল যেন কোনো বিশাল দৈত্য মাটির নিচে পা ছুঁড়ছে। ফ্ল্যাটের কাঁচের জানলাগুলো খড়খড় শব্দে কাঁপতে লাগল, মনে হল এখুনি ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। মাথার উপর থেকে অল্প অল্প করে ধুলো ঝরে পড়ছিল। আদিতি চোখ বন্ধ করে রোহনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার বুক ধড়ফড় করছিল, ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ। জীবনে কখনো এমন অভিজ্ঞতা হয়নি তার। কলকাতার ভূমিকম্পগুলো এতো ভয়াবহ ছিল না।
রোহনের হাতটা আদিতির কোমর জড়িয়ে শক্ত হয়ে আছে। তার বুকের উষ্ণতা আর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ আদিতির কানে পৌঁছাচ্ছিল। বাইরের শব্দগুলো তখন আরও তীব্র হয়েছে। মনে হচ্ছিল যেন পুরো বিল্ডিংটা বুঝি এখুনি ধসে পড়বে। আদিতি ভয়ে কাঁপছিল, তার শরীর হিম হয়ে আসছিল। কিন্তু রোহনের সেই দৃঢ় আলিঙ্গন, সেই উষ্ণতা যেন তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। সে বুঝতে পারছিল, রোহনও হয়তো ভয় পাচ্ছে, কিন্তু তার মুখের উপর একটা দৃঢ়তা, একটা সংকল্পের ছাপ। সে আদিতিকে রক্ষা করবেই।
ভূমিকম্পের প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক একটা ঘন্টার মতো মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সময় যেন থমকে গেছে, আর এই ভয়ঙ্কর মুহূর্তটা যেন কোনোদিন শেষ হবে না। আশেপাশে থেকে কাঁচ ভাঙার শব্দ, মানুষের চিৎকার, বিল্ডিং এর কড়কড় শব্দ আসছিল। আদিতি চোখ বন্ধ করে শুধু রোহনের বুকে মুখ লুকিয়ে ছিল।
অবশেষে, সেই বিকট শব্দ আর ঝাঁকুনি ধীরে ধীরে কমে এল। একসময় সবকিছু শান্ত হয়ে গেল। একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল চারদিকে, যা কিছুক্ষণ আগেকার ভয়ঙ্কর গর্জনের চেয়েও বেশি ভীতিকর মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন প্রকৃতি তার সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত হেনে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
রোহন ধীরে ধীরে আদিতিকে ছাড়ল। "আদিতি, তুমি ঠিক আছো?" তার কণ্ঠস্বর শান্ত, কিন্তু তাতে একটা চাপা উদ্বেগ।
আদিতি ভয়ে ভয়ে চোখ খুলল। চারপাশে তাকাতে তার বুক কেঁপে উঠল। ল্যাম্পশেডটা ভেঙে পড়ে আছে, টেবিলের উপর থেকে বইপত্র ছিটকে পড়েছে, কাঁচের গ্লাসগুলো ভেঙে ছড়িয়ে আছে মেঝেতে। দেওয়ালের প্লাস্টার অল্প অল্প করে ঝরে পড়েছে। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে, আদিতি দেখল রোহনকে। তার মুখটা ফ্যাকাশে, চোখে তখনও একটা উদ্বেগের ছাপ, কিন্তু সে ঠিক আছে।
"আমি... আমি ঠিক আছি," আদিতি কোনোমতে বলল, তার গলা কাঁপছিল।
রোহন আদিতিকে ডাইনিং টেবিলের নিচ থেকে বের করে আনল। আদিতি উঠে দাঁড়াতেই তার পা কাঁপছিল। রোহন তাকে আলতো করে ধরে রাখল। প্রথম কয়েক মুহূর্ত দু'জনেই কোনো কথা বলতে পারল না। কেবল একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকল। তাদের চোখে ছিল একই আতঙ্ক, একই স্বস্তির ছাপ।
হঠাৎ রোহন আদিতিকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এল এবং শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এ এক অন্যরকম আলিঙ্গন। এ আলিঙ্গনে কোনো শারীরিক আকর্ষণ ছিল না, ছিল শুধু প্রাণের অস্তিত্বের কৃতজ্ঞতা। জীবনের প্রতি, একে অপরের প্রতি এক গভীর, নীরব কৃতজ্ঞতা। আদিতি রোহনের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে শুরু করল। এ কান্না ভয়ের, এ কান্না স্বস্তির, এ কান্না ভালোবাসার। রোহন তার মাথায় আলতো করে হাত বুলাতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর আদিতি শান্ত হল। রোহন তার কপালে আলতো করে চুমু খেল। "আমরা ঠিক আছি, আদিতি। আমরা দু'জনেই ঠিক আছি।"
বাইরে তখনো ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছিল। কিন্তু বিদ্যুতের খুঁটিগুলো থেকে তার ছিঁড়ে যাওয়ায় পুরো এলাকা বিদ্যুৎবিহীন। ফ্ল্যাটটা অন্ধকার, কেবল জানলা দিয়ে বাইরের মেঘে ঢাকা আকাশের আবছা আলো আসছিল। তারা দু'জনেই মেঝেতে বসে পড়ল, ভেঙে যাওয়া কাঁচের টুকরোগুলো এড়িয়ে।
রোহন একটা মোমবাতি খুঁজে বের করল ডাইনিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে। দেশলাই দিয়ে জ্বালাতেই একটা হালকা হলুদ আভা ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। সেই মায়াবী আলোয় একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল তারা।
"আমি ভেবেছিলাম, সব শেষ হয়ে যাবে," আদিতি ফিসফিস করে বলল।
রোহন আদিতির হাতটা ধরল। "আমি তোমাকে ছাড়তাম না, আদিতি। কখনো না।"
আদিতি তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ভূমিকম্পের এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা তাদের নতুন সম্পর্কটাকে যেন এক মুহূর্তেই আরও গভীর করে দিল। তিন মাসের দাম্পত্যে যে নৈকট্য হয়তো ধীরে ধীরে গড়ে উঠত, ভূমিকম্পের কয়েক সেকেন্ডে তা যেন হাজার গুণ বেড়ে গেল। তারা বুঝতে পারল, জীবনের চরমতম বিপদেও তারা একে অপরের সবচেয়ে বড় ভরসা।
সেই রাতের আঁধারে, মোমবাতির আলোয়, তারা একে অপরের সাথে অনেক কথা বলল। ভয়, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, জীবনের মূল্যবোধ – সবকিছু নিয়ে। তারা দেখল, তাদের ভালোবাসার ভিত্তিটা কতটা মজবুত। ভূমিকম্পের সেই ঝাঁকুনি তাদের ঘরবাড়ি হয়তো নড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু তাদের সম্পর্কের ভিতকে করেছিল আরও অটল।
পরদিন সকালে যখন সূর্য উঠল, তখন দিল্লির আকাশে মেঘ কেটে গিয়ে রোদ ঝলমল করছে। ফ্ল্যাটের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ, ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলো সেই রাতের বিভীষিকার সাক্ষী হয়ে রইল। কিন্তু আদিতি আর রোহনের মনে তখন নতুন দিনের আশা। তারা একে অপরের দিকে তাকাল। রোহন আদিতির হাত ধরল, "চলো, সব ঠিক করে নেব।"
আদিতি হাসল। সে জানত, তাদের ভালোবাসার এই ঘর তারা আবার নতুন করে সাজিয়ে নেবে। ভূমিকম্প হয়তো সব ভেঙে দিয়েছিল, কিন্তু তাদের ভালোবাসা, তাদের বন্ধনকে আরও মজবুত করে তুলেছিল। এই বিপদ যেন তাদের চিনিয়ে দিল, জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান কী। আর তা হলো, একে অপরের পাশে থাকা। এই দিনটা ওদের জীবনের এক নতুন অধ্যায় হয়ে রইল। এ ছিল ওদের ভালোবাসার প্রথম অগ্নিপরীক্ষা, আর তাতে তারা দু'জনেই সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছিল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন