
উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি রাস্তার দুই পাশে ঘন সবুজের সমারোহ। মার্চ মাসের শেষ, হালকা ঠান্ডা বাতাসে এখনও বসন্তের রেশ লেগে আছে। দীর্ঘ অনেকটা বছর পর আমি আর মারিয়া আবার এক সাথে। আমাদের বিচ্ছেদটা তিক্ত ছিল না, ছিল পরিস্থিতির চাপে। দীর্ঘ বিরতির পর যখন আবারও দেখা হলো, দেখলাম মারিয়া সেই আগের মতোই স্নিগ্ধ। তার সাথে আছে তার দশ বছরের ছেলে, নীল। নীলকে একটা ভালো সময় উপহার দেওয়ার জন্য আমরা পরিকল্পনা করলাম শিলিগুড়ির এক বিনোদন পার্কে যাওয়ার।
যাত্রাপথের মুগ্ধতা
গাড়ির পেছনের সিটে নীল জানালার বাইরের চা-বাগান দেখে উচ্ছ্বসিত। আর আমার ঠিক পাশেই বসে আছে মারিয়া। রোদের ঝিলিক যখন ওর মুখে পড়ছিল, আমি বারবার আড়চোখে ওর দিকে তাকাতে বাধ্য হচ্ছিলাম। নীল শাড়ি আর কপালে একটা ছোট্ট কালো টিপ—মারিয়া যেন ঠিক কোনো কবিতার পাতা থেকে উঠে আসা নারী। ওর শান্ত স্বভাব আর মার্জিত সৌন্দর্য আমাকে বারবার সেই পুরনো দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। ওর চোখের মায়ায় এক অদ্ভুত টান আছে, যা এড়িয়ে যাওয়া আমার পক্ষে আজও অসম্ভব।
পুরো দিনটা কাটলো বিনোদন পার্কে। নীলের হাসিমুখ দেখে আমাদের দুজনের ক্লান্তিও যেন ম্লান হয়ে গিয়েছিল। মারিয়ার হাসিখুশি ভঙ্গি আর নীলের প্রতি ওর গভীর মমতা দেখে আমার মনে বারবার আসছিল—যদি সময়টা এখানেই থেমে যেত!
হোটেলের সেই মায়াবী রাত
সারাদিনের ঘুরাঘুরির পর আমরা একটা পাহাড়ি বাংলো টাইপ রিসোর্টে উঠলাম। নীলের জন্য পাশের একটা ছোট রুমের ব্যবস্থা ছিল, যাতে ও শান্তিতে ঘুমাতে পারে। রাতের খাবারের পর নীল যখন ওর রুমে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, আমি আর মারিয়া বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। সামনে মাইলের পর মাইল পাহাড়ের ঢালে জোনাকির মতো জ্বলছে চা-বাগানের বাংলোগুলোর আলো।
মারিয়ার পরনে তখন হালকা সুতির সালোয়ার কামিজ। ওর খোলা চুলগুলো পাহাড়ের ঠান্ডা বাতাসে উড়ছিল। আমি ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাতাসে ওর চুলের হালকা সুবাস আমার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দিচ্ছিল। আমি ওর হাতটা আলতো করে ধরলাম। মারিয়া চমকালো না, বরং ওর উষ্ণ হাতের ছোঁয়ায় আমাকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দিল।
"আজকের দিনটা খুব সুন্দর ছিল, তাই না?" মারিয়া খুব নিচু স্বরে বলল।
আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম। সেখানে মায়া আর দীর্ঘদিনের জমানো কিছু কথা যেন ভিড় করছিল। আমি ওর কপালে আলতো করে চুমু খেলাম। মারিয়া এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। ওর শরীরের সান্নিধ্য আমার রক্তে হিল্লোল তুলছিল, কিন্তু আমাদের সম্পর্কের এই পুনর্জাগরণে এক গভীর শ্রদ্ধাবোধও কাজ করছিল।
অনুভূতির গভীরতা
মাঝরাত পেরিয়ে গেছে। বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর ঝরনার শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। আমরা দুজনে ঘরের জানালার পাশে বসলাম। চাঁদের আলো ঘরের ভেতরটা একটা মায়াবী নীলচে আভা দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। মারিয়ার হাতের আঙুলগুলো যখন আমার চুলের মধ্যে দিয়ে বিলি কাটছিল, আমি অনুভব করলাম দীর্ঘদিনের এক শূন্যতা ভরে উঠছে।
আমি মারিয়াকে জড়িয়ে ধরলাম। ওর শরীরের উষ্ণতা, ওর নিঃশ্বাসের শব্দ—সবকিছুই ছিল এক অদ্ভুত মাদকতায় ভরা। আমরা একে অপরের সান্নিধ্য উপভোগ করছিলাম। কোনো অশ্লীলতা নয়, বরং এক পরম নির্ভরতায় আমরা একে অপরের আরও কাছে এলাম। দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ যেন সেই রাতে এক নিবিড় মিলনে পূর্ণতা পাচ্ছিল। মারিয়ার আদরে এক অদ্ভুত তৃপ্তি ছিল, যা কেবল দীর্ঘদিনের চেনা ভালোবাসাতেই পাওয়া সম্ভব।
ভোরের দিকে যখন মারিয়া আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল, আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলাম পাহাড়ের মাথায় ভোরের প্রথম আলো ফুটছে। আমি বুঝলাম, জীবনের এই পথচলায় ‘প্রাক্তন’ বলে কিছু হয় না যদি ভালোবাসাটা খাঁটি হয়। সেই রাতটি কেবল শরীরী মিলনের নয়, বরং ছিল দুটি অতৃপ্ত আত্মার এক সুগভীর সন্ধি।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন