গাড়ির জানালার বাইরে দিয়ে দ্রুতবেগে ধাবমান গাছপালা আর ধূসর রাস্তাটা যেন আমাদের জীবনের একঘেয়েমির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু গাড়ির ভেতরে তখন বইছিল এক অন্যরকম বসন্ত। আকাশ যখন আমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল, আমি অনুভব করলাম ওর আঙুলের ডগায় এক অদ্ভুত কম্পন। সেই কম্পন শুধু উত্তেজনার ছিল না, তাতে ছিল দুই বছরের জমানো এক পাহাড়প্রমাণ হাহাকার আর না বলা কথার প্রতিধ্বনি।
নীরবতার ভাষা
আমি যখন স্টিয়ারিং ধরে সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তখন আকাশের দৃষ্টি ছিল আমার প্রোফাইলে। ও মৃদু স্বরে বলল, "মায়া, কখনো ভেবেছিলে এই ব্যস্ত শহর আর অফিসের ফাইলের বাইরে আমরা এভাবে একা কোনো এক অজানার পথে পাড়ি দেব?"
ওর গলার স্বরে এক ধরনের আর্দ্রতা ছিল। আমি শুধু একটু হাসলাম, কিন্তু আমার বুকের ভেতর তখন তোলপাড় চলছে। ওর হাতটা যখন ধীরে ধীরে আমার কাঁধ থেকে নেমে এসে আমার পিঠের ওপর বিচরণ করতে শুরু করল, তখন মনে হলো আমার শিরদাঁড়া দিয়ে এক তীব্র বিদ্যুৎতরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে। সেই ছোঁয়া ছিল রেশমের মতো নরম, কিন্তু তার প্রভাব ছিল আগুনের মতো দাহ্য। আমি নিজের অজান্তেই গাড়ির গতি কমিয়ে দিলাম। গতির চেয়ে তখন ওর সান্নিধ্য আমার কাছে অনেক বেশি সত্য হয়ে উঠেছিল।
অনুভূতির শিখা
রাস্তার ধারের সোডিয়াম আলো তখনো জ্বলে ওঠেনি, কিন্তু গোধূলির সেই মায়াবী আলোয় আকাশের মুখটা আমার কাছে অপার্থিব মনে হচ্ছিল। ও আমার চুলে মুখ ডুবিয়ে দীর্ঘশ্বাস নিল। সেই নিঃশ্বাসের উষ্ণতা আমার ঘাড়ে এক শিরশিরানি জাগাল। আমি এক হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখে অন্য হাতটা ওর হাঁটুর ওপর রাখলাম। ওর জিন্সের ওপর দিয়েও আমি অনুভব করতে পারছিলাম ওর শরীরের সেই উত্তাপ—যে উত্তাপ আমাকে বহু নির্ঘুম রাতে অস্থির করে তুলত।
আকাশের হাত যখন আমার শরীরের ভাঁজে ভাঁজে তার অধিকার স্থাপন করছিল, আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলাম। ও আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "আজ আমাদের থামানোর কেউ নেই মায়া। আজ শুধু আমি আর তুমি।"
ওর সেই তপ্ত শ্বাস আমার সমস্ত শরীরে এক ধরনের অবশ ভাব এনে দিল। আমি অনুভব করলাম আমার অন্তরাত্মা যেন গলে জল হয়ে যাচ্ছে। ওর আঙুলগুলো যখন আমার হাতের তালুতে আলতো করে ঘষছিল, আমি চোখে সর্ষে ফুল দেখছিলাম। পৃথিবীর সব নিয়ম, সব নীতি যেন সেই মুহূর্তে ফিকে হয়ে আসছিল।
সেই নির্জন সন্ধ্যাবলা
বিশ্রামাগারের সেই মুহূর্তগুলো ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে দামী সময়। চারপাশটা নিঝুম, কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছিল। আকাশ যখন আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরল, মনে হলো আমি যেন আমার চিরচেনা আশ্রয়ে ফিরে এসেছি। ওর বুকের ধুকপুকানি আমি নিজের কানে শুনতে পাচ্ছিলাম। ওর ঠোঁট যখন আমার কপালে, গালে আর ঘাড়ে বিচরণ করছিল, আমি চোখ বুজে সেই স্বর্গীয় সুখ উপভোগ করছিলাম।
ওর দুহাতের বাঁধন যখন আরও শক্ত হলো, আমি বুঝতে পারলাম এই পুরুষটি আমাকে কতটা গভীরভাবে চায়। ওর চোখের কোণে এক ফোঁটা জল আমি দেখেছি—সেটা ছিল পাওয়ার আনন্দ আর না পাওয়ার যন্ত্রণার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। ও আমায় জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল, "তোমাকে ছাড়া অফিসের প্রতিটি দিন আমার কাছে কত দীর্ঘ মনে হয়, তা কি তুমি জানো?"
আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি, শুধু ওর বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই কান্না ছিল সুখের।
মোহময় রাত
মোটেলে পৌঁছানোর পর সেই রাতের প্রতিটি প্রহর ছিল আমাদের অনুরাগের সাক্ষী। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর ভেতরে আমাদের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। রুমের ডিম লাইটের নীলচে আলোয় আকাশ যখন আমার সামনে দাঁড়াল, আমার মনে হলো পৃথিবীর সব সৌন্দর্য ওর মাঝেই লুকিয়ে আছে। ওর প্রতিটি স্পর্শে ছিল আগ্নেয়গিরির লাভা, যা আমাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছিল আবার নতুন করে জন্ম দিচ্ছিল।
আমরা একে অপরের হৃদস্পন্দন গুনছিলাম। সেই রাতে ক্ষুধার চেয়েও বড় ছিল তৃষ্ণা—একে অপরকে সম্পূর্ণভাবে পাওয়ার তৃষ্ণা। ওর ঠোঁটের ছোঁয়ায় আমি আমার অস্তিত্ব ভুলে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল আমরা যেন এক অনন্ত সমুদ্রের ঢেউয়ে ভাসছি, যেখানে কূল নেই, কিনারা নেই—আছে শুধু ভালোবাসার অতল গভীরতা।
সকালের সূর্য যখন জানালার পর্দা চিরে ঘরে ঢুকল, আমি দেখলাম আকাশ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে তখন প্রশান্তি, যেন এক দীর্ঘ যুদ্ধের পর ও বিজয়ী হয়েছে। আমাদের এই প্রেম হয়তো সমাজের চোখে গোপন, হয়তো অফিসের ফাইলে এর কোনো স্থান নেই, কিন্তু সেই কয়েকটা দিন আমরা একে অপরের আত্মায় যে ছাপ রেখে এসেছি, তা কোনো রিপোর্টেই লেখা সম্ভব নয়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন