সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নীলগিরির সেই কুয়াশাঘেরা বিকেল

Bengali love story scene in Nilgiri mountains.


অনির্বাণ যখন কোলকাতা থেকে নীলগিরির পথে রওনা হয়েছিল, তখন তার মনে ছিল না কোনো বিশেষ পরিকল্পনা। কেবল ছিল একঘেয়ে যান্ত্রিক জীবন থেকে মুক্তি আর দীর্ঘদিনের পরিচিত বন্ধু অর্পিতার পরিবারের সাথে দেখা করার এক অদ্ভুত টান। অনির্বাণের বয়স এখন পঁচিশ, আর অর্পিতা তার চেয়ে দু-বছরের ছোট। দীর্ঘ দুই বছর ধরে তাদের বন্ধুত্ব এক গভীর পরিণতির দিকে এগোচ্ছে।

তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটোর বিমানবন্দরে যখন অনির্বাণ নামল, তখন বাইরে বৃষ্টির আবহাওয়া। কথা ছিল অর্পিতার বাবা তাকে নিতে আসবেন, কিন্তু গাড়ির দরজা খুলে যা দেখল তাতে সে থমকে দাঁড়াল। গাড়ির চালকের আসনে অর্পিতার দিদি, অবন্তিকা। ঠিক যেন অর্পিতারই এক প্রতিচ্ছবি, কিন্তু ব্যক্তিত্বে আরও কিছুটা গম্ভীর এবং মোহময়ী।

কুয়াশার পথে প্রথম সংলাপ

গাড়ি পাহাড়ি পথ বেয়ে উপরে উঠছে। চারদিকে পাইন গাছের সারি আর মেঘেদের আনাগোনা। অবন্তিকা হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে জিজ্ঞেস করল, "অর্পিতা কেমন আছে অনির্বাণ? ও কি খুব মন খারাপ করছে তুমি এখানে একা চলে এলে বলে?"

অনির্বাণ মৃদু হেসে উত্তর দিল, "একটু তো বটেই। তবে ও জানে আমার এই সফরটা খুব দরকার ছিল। পাহাড়ি নিস্তব্ধতা না পেলে হয়তো আমার লেখাটা আর শেষ হতো না।"

অবন্তিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "নিস্তব্ধতা মাঝে মাঝে খুব ভারী হয়ে ওঠে, জানো? আমি গত কয়েকমাস ধরে এই পাহাড়ের নির্জনতায় নিজেকে বড্ড একা অনুভব করছি।"

তার কণ্ঠস্বরে এমন এক বিষণ্ণতা ছিল যা অনির্বাণের মনকে মুহূর্তের জন্য আর্দ্র করে তুলল। সে জানত না যে এই সফরের প্রতিটি মোড় তার জীবনের এক নতুন অনুভূতির দ্বার খুলে দেবে।


এক পশলা বৃষ্টির স্মৃতি

নীলগিরির বাংলোয় পৌঁছানোর পর সন্ধ্যার দিকে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। অবন্তিকা অনির্বাণের জন্য কফি নিয়ে বারান্দায় এল। পরনে তার সাধারণ এক নীল রঙের শাড়ি, যা তাকে প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছিল।

অনির্বাণ বৃষ্টির শব্দে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল পাহাড়ের দিকে। অবন্তিকা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে পাশে বসল। সে বলল, "অর্পিতা আমাকে তোমার সম্পর্কে অনেক কিছু বলেছে। ও সবসময় বলত, তোমার চোখের চাউনিতে না কি এক অদ্ভুত জাদু আছে, যা মানুষকে খুব সহজেই আপন করে নেয়।"

অনির্বাণ একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। ঠিক সেই মুহূর্তে বিদ্যুতের এক তীব্র চমকানিতে অবন্তিকা শিউরে উঠে অনির্বাণের হাতটা শক্ত করে ধরল। সেই প্রথম স্পর্শে কোনো কামনার লেশ ছিল না, ছিল কেবল আশ্রয়ের এক পরম আকুতি। বৃষ্টির ঝাপটা বারান্দায় আছড়ে পড়ছিল, আর সেই সিক্ত সন্ধ্যায় দুজন মানুষের হৃদস্পন্দন এক সুতোয় গেঁথে গেল।


অনুভূতির বিনিময়

পরের কয়েকদিন অনির্বাণ আর অবন্তিকা ঘুরে বেড়াল পাহাড়ের আনাচে-কানাচে। কুয়াশার চাদর মোড়া চা-বাগান থেকে শুরু করে ঝরনার শীতল জল—সবখানেই তারা খুঁজে পেল একে অপরের সঙ্গ।

এক সন্ধ্যায়, যখন পাইন বনের মাঝ দিয়ে তারা হাঁটছিল, অবন্তিকা হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে বলল, "অনির্বাণ, ভালোবাসা কি কেবল একজনের জন্যই বরাদ্দ থাকে? নাকি মানুষের মন একই সাথে দুজনকে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার জায়গায় বসাতে পারে?"

অনির্বাণ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "মন তো কোনো ধরাবাঁধা ব্যাকরণ মেনে চলে না, অবন্তিকা। তবে সম্পর্কের নাম যাই হোক, সেখানে সততা থাকাটা খুব জরুরি।"

অবন্তিকা অনির্বাণের চোখের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। তার চোখের কোণে তখন এক ফোঁটা জল চিকচিক করছিল। সে খুব নিচু স্বরে বলল, "অর্পিতা খুব ভাগ্যবতী যে ও তোমাকে পেয়েছে। আর আমি আজ নিজেকে খুব রিক্ত মনে করছি কারণ আমি হয়তো অনেকটা দেরি করে ফেললাম।"


বিদায়বেলা

সপ্তাহটা শেষ হয়ে এল। অনির্বাণের ফেরার সময় হয়েছে। বিদায়বেলা যখন অবন্তিকা তাকে আবার বিমানবন্দরে ছাড়তে এল, তখন চারপাশ নিস্তব্ধ। নীলগিরির পাহাড় আজ যেন মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়ে আছে।

গাড়ি থেকে নামার সময় অবন্তিকা অনির্বাণের হাতে একটি ছোট চিরকুট গুঁজে দিল। সেখানে লেখা ছিল:

"জীবন সবসময় আমাদের যা দেয়, তা আমরা গ্রহণ করতে পারি না। আবার যা আমরা চাই, তা হয়তো আমাদের জন্য নয়। কিন্তু এই একটা সপ্তাহ আমার একাকিত্বের জীবনে যে মায়ার ছোঁয়া দিয়ে গেলে, তা আমি আজীবন মনে রাখব। ভালো থেকো, আর অর্পিতাকে খুব সুখে রেখো।"

অনির্বাণ বিমানের জানালার পাশে বসে যখন নিচে মেঘেদের পাহাড় দেখছিল, তখন তার মনে হচ্ছিল—সব ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না, কিছু ভালোবাসা কেবল স্মৃতি হয়েই বেঁচে থাকে পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা কুয়াশার মতো। চিরকালীন, অথচ অধরা।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দুপুরের ভালবাসা

  অফিসের ব্যস্ত পরিবেশের মধ্যেও দীপকের দিকে তাকালে হৃদয়ের গভীরে এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করত সায়নার। কয়েক সপ্তাহ হলো তাদের বন্ধুত্ব একটু ভিন্ন মোড় নিয়েছে, কিন্তু সায়না জানে—এই সম্পর্ক তার জীবনকে বদলে দেবে চিরদিনের জন্য। সবকিছু শুরু হয়েছিল এক দুপুরের বিরতিতে। দীপক সায়নাকে বলল, "চলো, ব্যাংকে যেতে হবে, তুমি সঙ্গ দেবে?" সায়না কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেল। দীপকের গাড়িতে উঠতেই সে অনুভব করল এক অদ্ভুত উত্তেজনা, এক মিষ্টি টান। অফিসে ব্যস্ততার কারণে সারাদিন ওদের মধ্যে খুব কম কথাই হয়, তাই দীপকের সঙ্গে একান্তে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে ওর মন আনন্দে নেচে উঠল। ড্রাইভের সময় দীপকের দৃঢ় হাতে স্টিয়ারিং চাকা ধরার ভঙ্গিটা সায়নার মনে একরকম শিহরণ জাগাল। ওর মনের মাঝে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করছিল। গাড়িতে বসে সে দীপকের দিকেই তাকিয়ে রইল। দীপক ব্যাংকে কাজ সেরে যখন ফিরে এল, তখন ওর হেঁটে আসার দৃশ্য দেখে সায়নার বুকের ভিতর ধকধক করতে লাগল। দীপকের সুগঠিত শরীর, চোখের সেই গভীরতা—সব মিলিয়ে ও যেন এক মোহময় মানুষ। গাড়িতে উঠে দীপক একঝলক তাকিয়েই বুঝতে পারল সায়নার মনের অবস্থা। — "কী হলো? চুপ করে আছো কেন?...

অন্তহীন তৃষ্ণা: হৃদয়ের এক অবাধ্য উপাখ্যান

সূচনা: বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা ঢাকা শহরের ধুলোবালি আর ব্যস্ততার মাঝেও কিছু মুহূর্ত আসে যা জীবনকে আমূল বদলে দেয়। নীলার জীবনে হেনরি (সায়েম) ছিল সেই কালবৈশাখী ঝড়ের মতো—অপ্রত্যাশিত কিন্তু অনিবার্য। তাদের পরিচয়ের পর থেকে গত তিন মাসে নীলা এক অন্য জগতে বাস করছে। সায়েমকে দেখার পর থেকে তার ভেতরে এমন এক সুপ্ত কামনার জন্ম হয়েছে, যা সে আগে কখনও অনুভব করেনি। গত সাত মাস কোনো পুরুষের ছোঁয়া না পাওয়া শরীরটা যেন কেবল সায়েমের অপেক্ষাতেই ছিল। নীলা জানত না সায়েমের মধ্যে কী এমন জাদুকরী শক্তি আছে, কিন্তু তার গভীর চোখের চাউনি আর গম্ভীর কণ্ঠস্বর নীলার দীর্ঘদিনের সাজানো ‘সংকল্প’ বা 'রেজোলিউশন' ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। প্রথম রাতের সেই উন্মাদনা সেদিন ছিল এক মেঘলা রাত। নীলার ড্রয়িংরুমে বসে তারা কফি খাচ্ছিল। নীলার মনে কোনো অভিসন্ধি ছিল না; সে কেবল সায়েমের সান্নিধ্য চেয়েছিল। কিন্তু সায়েম যখন কাছে এসে নীলার কপালে আলতো করে চুমু খেল এবং খুব ধীর স্বরে কথা বলতে শুরু করল, নীলা যেন সম্মোহিত হয়ে গেল। সায়েমের পুরুষালি সুবাসে নীলা মাতাল হয়ে যাচ্ছিল। নীলা নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু সায়েমের হাতের ছোঁয়া যখন তার ...

रंग, प्रेम और कला: एक अधूरी दास्तान | Hindi Romantic Story for Artists

कला एक ऐसी भाषा है जिसकी कोई सीमा नहीं होती। यह भावनाओं को, छुअन को और रंगों को एक ऐसे कैनवास पर उकेरती है जो शब्दों से परे होता है। भारत जैसे देश में, जहाँ कला और संस्कृति की जड़ें बहुत गहरी हैं, प्रेम को अक्सर एक आध्यात्मिक और दिव्य रूप में देखा गया है। लेकिन कभी-कभी, दो अलग-अलग पीढ़ियों, दो अलग-अलग दृष्टिकोणों के बीच का प्रेम भी रंगों की तरह आपस में घुल-मिल जाता है। यह कहानी है एक ऐसे चित्रकार की, जिसकी उम्र के इस पड़ाव पर कला ही उसका सब कुछ थी, और एक ऐसी युवा लड़की की जो रंगों की दुनिया में अपनी पहचान बनाना चाहती थी। पहला अध्याय: कला की दुनिया और मुलाकात मैं लगभग पैंतीस साल का हूँ और बारह साल की उम्र से कला और रंगों की दुनिया में डूबा हुआ हूँ। मेरी आँखों ने रंगों के अनगिनत शेड्स देखे हैं, लेकिन जब आप एक ऐसे शहर में रहते हैं जहाँ युवा और ऊर्जावान छात्र-छात्राएं कला सीखने आते हैं, तो जीवन का नजरिया थोड़ा बदल जाता है। यहाँ एक प्रसिद्ध कला महाविद्यालय है, जहाँ के छात्रों के पास अभी सीखने के लिए बहुत कुछ है। लेकिन हर नए सेमेस्टर के साथ, जीवन में कुछ नई ऊर्जा, कुछ नए रंग और कुछ ताज़गी जर...