
অনির্বাণকে প্রথম দেখলে যে কেউ বলবে—এই মানুষটি যেন এক চলমান স্থিরতা। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, চুলে পাক ধরেছে, চোখে এক ধরনের গভীর শান্তি। অফিসে তিনি খুব বেশি কথা বলেন না, কিন্তু যখন বলেন, তখন তা ভেবে-চিন্তেই বলেন। সহকর্মীরা তাকে সম্মান করে, কেউ কেউ একটু ভয়ও পায়। কারণ অনির্বাণ কখনো কারও সামনে নিজেকে প্রকাশ করেন না সহজে।
এই দপ্তরটা একটু অন্যরকম। এখানে নারীদের সংখ্যাই বেশি। প্রত্যেকের জীবনে আছে নিজস্ব গল্প—কারও বিবাহ ভেঙেছে, কেউ একা সন্তান বড় করছে, কেউ আবার নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে লড়াই করছে। এই কোলাহল, ব্যস্ততা আর অদৃশ্য সংগ্রামের ভিড়ে অনির্বাণ যেন এক নীরব আশ্রয়।
আর ঠিক তার পাশের কিউবিকলেই বসে অনন্যা।
অনন্যাকে প্রথম দেখলে যে কেউ একটু থমকে যাবে। ত্রিশোর্ধ্ব এই নারীটির মধ্যে এক অদ্ভুত প্রাণশক্তি আছে। তার চোখে যেন সারাক্ষণ গল্প খেলা করে। মুখে হাসি লেগেই থাকে, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে একটা গভীর ক্লান্তি, একটা না-বলা ব্যথাও লুকিয়ে আছে—যা খুব কাছে না গেলে বোঝা যায় না।
অনন্যা তার দুই সন্তানকে নিয়ে একাই থাকে। জীবনের কঠিন সময় পার করে সে আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তার ভিতরের কোমলতাটা এখনো মরে যায়নি। বরং সেটাই তাকে আরও বেশি জীবন্ত করে তুলেছে।
প্রথম দিকে অনির্বাণ অনন্যাকে খুব একটা খেয়াল করেনি। অফিসের অন্যদের মতোই তাকে দেখত—একজন সহকর্মী হিসেবে। কিন্তু ধীরে ধীরে, অজান্তেই, অনন্যা তার নজরের ভেতর ঢুকে পড়ল।
একদিন দুপুরবেলা, সবাই যখন টিফিনে ব্যস্ত, অনির্বাণ তখন নিজের টেবিলে বসে ফাইল দেখছিল। হঠাৎ করেই তার সামনে এসে দাঁড়াল অনন্যা।
“দাদা, আজ কী এনেছেন?” — তার কণ্ঠে একধরনের চপলতা।
অনির্বাণ মাথা তুলে তাকাল, একটু অবাক হয়ে। “কেন?”
অনন্যা হেসে বলল, “একাই খাবেন? একটু ভাগ দেবেন না?”
সেই প্রথমবার অনির্বাণ খেয়াল করল—অনন্যার হাসিটা কতটা স্বাভাবিক, কতটা নির্ভার। সে অদ্ভুতভাবে অপ্রস্তুত হয়ে গেল। তবুও টিফিন বক্সটা এগিয়ে দিল।
সেদিনের সেই ছোট্ট মুহূর্তটাই যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়ে রইল।
এরপর থেকে প্রায়ই এমন হতে লাগল। কখনো অনন্যা তার টেবিলের কোণে বসে গল্প করছে, কখনো কাজের ফাঁকে এসে কোনো অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করছে, কখনো বা ভিড়ের মাঝে খুব কাছে এসে দাঁড়াচ্ছে।
অনির্বাণ বুঝতে পারছিল—এই কাছাকাছি আসাটা শুধু ঘটনাচক্র নয়।
কিন্তু সে নিজেকে সংযত রাখত। তার ভেতরে একটা দ্বিধা ছিল—এই বয়সে, এই পরিস্থিতিতে, এমন অনুভূতি কি ঠিক?
তবুও, মন তো যুক্তির কথা শোনে না।
অনন্যার হাসি, তার চোখের চাউনি, তার কথা বলার ভঙ্গি—সবকিছু যেন ধীরে ধীরে অনির্বাণের ভেতরে এক অচেনা আলো জ্বালিয়ে দিচ্ছিল।
একদিন বিকেলে, আকাশটা ছিল ভারী। মেঘে ঢাকা, যেন বৃষ্টি নামার অপেক্ষায়।
অনির্বাণ একটি কেস স্টাডি নিয়ে অনন্যার ডেস্কে গেল। দুজন পাশাপাশি বসে কাজের আলোচনা করছিল। হঠাৎই অনন্যা চুপ করে গেল।
অনির্বাণ তাকাল তার দিকে।
অনন্যা তার শাড়ির আঁচলটা একটু ঠিক করতে গিয়ে থেমে গেল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাল অনির্বাণের দিকে।
সেই দৃষ্টিতে ছিল এক অদ্ভুত খেলা—দুষ্টুমি, আমন্ত্রণ, আর কিছু না-বলা কথা।
“অনির্বাণ বাবু…” — সে খুব আস্তে বলল।
“হ্যাঁ?”
“আপনি যতটা গম্ভীর সাজেন, আড়ালে নিশ্চয়ই ততটা নন।”
অনির্বাণ একটু হেসে ফেলল। “তা কে বলল?”
অনন্যা একটু ঝুঁকে এল, কণ্ঠটা আরও নরম করে বলল,
“আমি ভাবছি… আজ সন্ধ্যায় আপনার বাড়িতে একটা হানা দিলে কেমন হয়?”
কথাটা শুনে অনির্বাণ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। যেন বুঝে উঠতে পারছিল না—এটা মজা, না সিরিয়াস।
সে হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“আসবেন নাকি সত্যিই?”
অনন্যা চোখের কোণে এক চিলতে হাসি এনে বলল,
“দেখে নিন।”
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে অনির্বাণ নিজেকে অদ্ভুতভাবে অস্থির মনে করছিল। বারবার অনন্যার কথা মনে পড়ছিল।
“সে কি সত্যিই আসবে?”
এই প্রশ্নটা মাথায় ঘুরছিল, কিন্তু সে নিজেই নিজেকে বোঝাল—না, এটা নিছক মজা।
বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঝিরঝিরে শব্দে চারপাশ ভরে উঠেছে।
অনির্বাণ আরামকেদারায় বসে বই পড়ছিল। হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠল।
সে একটু চমকে উঠল।
দরজা খুলতেই—সমস্ত ভাবনা থেমে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে অনন্যা।
নীল রঙের চুড়িদার, ভেজা চুল, চোখে সেই চেনা দীপ্তি।
“বলেছিলাম না আসব?” — সে হেসে বলল।
অনির্বাণ কয়েক মুহূর্ত কিছু বলতে পারল না। তারপর ধীরে সরে দাঁড়িয়ে বলল,
“ভেতরে আসো…”
ঘরের ভেতরে এক অদ্ভুত নীরবতা ছিল। বৃষ্টির শব্দ যেন সেই নীরবতাকে আরও গভীর করে তুলেছিল।
অনন্যা সোফায় বসে চারপাশে তাকাল।
“খুব শান্ত আপনার বাড়ি…”
অনির্বাণ হালকা হেসে বলল,
“একা মানুষ… শান্তই হবে।”
এই কথাটার ভেতরে একটা নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে ছিল, যা অনন্যা সহজেই বুঝে ফেলল।
“একাকীত্বটা কি খুব কষ্ট দেয়?” — সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
অনির্বাণ একটু থেমে বলল,
“কখনো দেয়… কখনো আবার অভ্যাস হয়ে যায়।”
অনন্যা চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে বলল,
“আমি জানি কেমন লাগে…”
সেই রাতে তাদের কথা শেষই হচ্ছিল না।
প্রথমে কাজের আলোচনা, তারপর ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত জীবনের কথা।
অনন্যা তার ভাঙা সম্পর্কের গল্প বলল, তার লড়াইয়ের কথা বলল, তার সন্তানদের নিয়ে তার স্বপ্নের কথা বলল।
অনির্বাণ মন দিয়ে শুনছিল। মাঝে মাঝে শুধু ছোট ছোট প্রশ্ন করছিল।
তার মনে হচ্ছিল—এই নারীটা কতটা শক্ত, আবার কতটা ভঙ্গুর।
অনন্যা যখন কথা বলছিল, তার চোখে মাঝে মাঝে জল চিকচিক করছিল। কিন্তু সে হাসছিল—সবসময়।
একসময় অনির্বাণ বলল,
“তুমি খুব শক্ত মেয়ে…”
অনন্যা হেসে বলল,
“না… আমি শুধু ভেঙে পড়ার সময় পাই না।”
এই কথাটায় অনির্বাণের বুকটা কেমন করে উঠল।
রাত বাড়ছিল। বৃষ্টিও থামেনি।
ঘরের আলোটা নরম হয়ে এসেছিল।
অনন্যা ধীরে ধীরে অনির্বাণের কাছাকাছি সরে এল। কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, কোনো অস্বস্তিও না—শুধু এক স্বাভাবিক টান।
সে আলতো করে অনির্বাণের হাতটা ধরল।
সেই স্পর্শে যেন সময় থেমে গেল।
অনির্বাণ প্রথমে একটু চমকে উঠেছিল, কিন্তু তারপর হাতটা সরায়নি।
তাদের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল।
সেই চোখে কোনো প্রশ্ন ছিল না—ছিল শুধু বোঝাপড়া।
অনন্যা খুব আস্তে বলল,
“আপনার সাথে কথা বললে… মনে হয় আমি একা নই।”
অনির্বাণের গলায় শব্দ আটকে গেল।
সে শুধু বলল,
“আমিও…”
সেই মুহূর্তটা ছিল খুব নিঃশব্দ, কিন্তু খুব গভীর।
তারা একে অপরের খুব কাছে ছিল, কিন্তু কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, কোনো দাবি ছিল না।
শুধু ছিল এক অদ্ভুত শান্তি।
অনন্যা মাথাটা হেলিয়ে দিল অনির্বাণের কাঁধে।
অনির্বাণ প্রথমে স্থির হয়ে রইল, তারপর খুব ধীরে তার মাথার ওপর হাত রাখল।
এই স্পর্শে কোনো কামনা ছিল না—ছিল এক ধরনের আশ্রয়।
রাতটা যেন তাদের জন্য অন্যরকম হয়ে উঠল।
তারা গল্প করল, হাসল, মাঝে মাঝে চুপ করে রইল।
সেই নীরবতাগুলোও যেন কথা বলছিল।
কখনো অনন্যা বলছিল তার ছোটবেলার কথা, কখনো অনির্বাণ বলছিল তার হারিয়ে যাওয়া দিনের স্মৃতি।
দুজনেই বুঝতে পারছিল—এই সংযোগটা সাধারণ নয়।
পরদিন সকালে যখন আলো ঘরে ঢুকল, তখন তারা দুজনেই এক নতুন অনুভূতির মধ্যে ছিল।
একসাথে চা খেল।
অনন্যা হাসতে হাসতে বলল,
“আপনি কিন্তু ভালো চা বানান।”
অনির্বাণ বলল,
“তুমি এলে আরও ভালো লাগে বানাতে।”
অনন্যা একটু চুপ করে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
সেই দৃষ্টিতে ছিল এক ধরনের স্বীকৃতি।
অফিসে ফিরে তারা আবার আগের মতোই।
দুজনেই নিজেদের জায়গায়, নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
কেউ বুঝতেই পারল না—তাদের মধ্যে কী বদলে গেছে।
কিন্তু মাঝে মাঝে যখন চোখাচোখি হয়, তখন এক ছোট্ট হাসি খেলে যায়।
সেই হাসিতে লুকিয়ে থাকে এক গোপন গল্প।
এখন তাদের দেখা হয় নিয়মিত।
সপ্তাহে একদিন, কখনো দুদিন।
অনন্যা আসে অনির্বাণের বাড়িতে।
সেখানে কোনো অফিস নেই, কোনো চাপ নেই।
শুধু আছে গান, গল্প, আর একে অপরকে একটু একটু করে জানা।
অনির্বাণ তার পুরনো গানগুলো শোনায়, অনন্যা তার প্রিয় কবিতাগুলো পড়ে শোনায়।
কখনো তারা একসাথে চুপ করে বসে থাকে—বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে।
এই সম্পর্কটা তারা লুকিয়ে রেখেছে।
কারণ তারা জানে—সবকিছু সবার সামনে আনা যায় না।
কিছু অনুভূতি শুধু নিজের জন্যই ভালো।
তাদের এই গোপন ভালোবাসা যেন তাদের জীবনের প্রতিটা দিনকে নতুন করে রাঙিয়ে দিচ্ছে।
অফিসের সেই করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে, ভিড়ের মাঝে চোখাচোখি হলে, তারা দুজনেই জানে—
এই সম্পর্কটা শুধু তাদের।
একটা নীরব বসন্ত, যা কারও চোখে পড়ে না… কিন্তু তাদের হৃদয়ে প্রতিদিন ফুল ফোটায়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন