কলকাতার ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে চব্বিশ ঘণ্টার সেই সুপারস্টোরটি যখন রাতের নিস্তব্ধতায় ডুবে যায়, ঠিক তখন আমার পাল্লা শুরু হয়। রাত তিনটে। শহরের কোলাহল তখন স্তিমিত, শুধু মাঝে মাঝে দু-একটা লরি যাওয়ার শব্দ শোনা যায়। আমি তখন দোকানের কাঁচের দরজাটা আটকে দিয়ে সোডা আর জুসের কুলারগুলো গোছাতে শুরু করি। এই সময়টাই আমার সবচেয়ে প্রিয়, কারণ এই নির্জনতায় নিজের মনের সাথে কথা বলা যায়।
ঠিক এই সময়েই পুলিশের গাড়িটা এসে দাঁড়ায় দোকানের সামনে। নিয়মমাফিক তদারকি। আর সেই গাড়িতে করেই আসে সে—অফিসার অভিক। তিন সপ্তাহ আগে যখন তাকে প্রথম দেখেছিলাম, মনে হয়েছিল কোনো পুরনো উপন্যাসের বলিষ্ঠ নায়ক জীবন্ত হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদেহী, চওড়া কাঁধ, আর চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। বয়সে আমার চেয়ে বেশ খানিকটা বড় হলেও, তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন একটা ভরসা আছে যা আমাকে চুম্বকের মতো টানে।
সেদিন রাতটা ছিল একটু অন্যরকম। হালকা বৃষ্টি নামায় চারপাশটা বেশ শীতল হয়ে উঠেছিল। অভিক যখন ভেতরে এলো, আমি অন্যমনস্ক হয়ে দরজাটা লক করে দিলাম। খেয়ালই করিনি ও তখনো ভেতরে। যখন বুঝলাম, তখন এক অদ্ভুত আবেশ আমাকে ঘিরে ধরল। চারদিকে সারিবদ্ধ তাকে সাজানো পানীয়ের বোতল, মৃদু এসি-র শব্দ আর আমরা দুজন।
অনুরাগের ছোঁয়া
আমি যখন কুলারের তাকে বোতলগুলো সাজাচ্ছিলাম, অভিক ধীর পায়ে আমার পেছনে এসে দাঁড়ালো। ওর গায়ের সেই পরিচিত পুরুষালি সুগন্ধ আর বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ মিশে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হলো। ও আলতো করে আমার কোমরে হাত রাখল। সেই স্পর্শে আমার শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। আমি ঘুরে তাকাতেই দেখলাম ওর গভীর চোখ দুটো আমার দিকে চেয়ে আছে—সেখানে কোনো লালসা নয়, বরং ছিল এক আকাশ সমান মুগ্ধতা।
ও আমাকে নিজের কাছে টেনে নিল। ওর সেই শক্ত সামর্থ্য বাহুডোর আমাকে এক অদ্ভুত নিরাপত্তা দিচ্ছিল। আমি ওর উর্দির রুক্ষ কাপড়ের ওপর দিয়ে ওর বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শ অনুভব করছিলাম। আমার মনে হলো, এই নির্জন রাতে আমরা যেন পৃথিবীর বাইরের কোনো এক জগতে চলে এসেছি। আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম, সেখানে এক অব্যক্ত আমন্ত্রন। আমি ওর চওড়া কাঁধে মাথা রাখলাম, শুনতে পাচ্ছিলাম ওর হৃদপিণ্ডের দ্রুত স্পন্দন।
ভালোবাসার আলিম্পন
অভিক নিচু হয়ে আমার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। ওর আঙুলগুলো যখন আমার হাতের ওপর দিয়ে বিচরণ করছিল, আমার মনে হচ্ছিল বসন্তের এক ঝোড়ো হাওয়া আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ও আমার চিবুক তুলে ধরল। ওর উষ্ণ নিঃশ্বাস আমার মুখে আছড়ে পড়ছিল। ও খুব ধীরে, খুব মায়ায় আমার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল। সেই স্পর্শে আমার চোখের পাতা বুজে এলো।
"জানো," ও ফিসফিস করে বলল, "সারাদিনের ডিউটির শেষে এই আধো আলো-ছায়ার দোকান আর তোমার এই হাসিটাই আমার বেঁচে থাকার রসদ।"
ওর এই সহজ স্বীকারোক্তি আমাকে ভেতরে ভেতরে গলিয়ে দিল। ও ধীরে ধীরে আমার চুলের বাঁধন আলগা করে দিল। আমার পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়া চুলের গুচ্ছ নিয়ে ও খেলতে শুরু করল। ওর হাতের স্পর্শে যে গভীর মমতা ছিল, তা আমার সারা জীবনের একাকীত্বকে এক নিমেষে মুছে দিচ্ছিল। আমরা একে অপরের খুব কাছে এলাম। ওর ঠোঁট যখন আমার ঠোঁট স্পর্শ করল, মনে হলো মহাকাল থমকে দাঁড়িয়েছে। সে এক দীর্ঘ, নিবিড় এবং পবিত্র আবেশ।
গভীর অনুভূতির জলছবি
সেই শীতল ঘরে আমাদের ভালোবাসার উত্তাপ বাড়তে লাগল। কোনো কর্কশতা নয়, বরং এক আদিম এবং শাশ্বত ছন্দে আমরা একে অপরের সত্তায় মিশে যাচ্ছিলাম। অভিক আমাকে আগলে ধরেছিল এক মূল্যবান রত্নের মতো। ওর প্রতিটি স্পর্শে ছিল সম্মান আর ভালোবাসার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।
আমরা অনেকটা সময় সেখানে কাটাতে পারতাম, কিন্তু সময় তো কারো জন্য থেমে থাকে না। ভোরের আলো ফুটতে আর খুব বেশি দেরি নেই। আমরা দুজনেই নিজেদের গুছিয়ে নিলাম। আয়নায় যখন আমার চেহারাটা দেখলাম, লক্ষ্য করলাম আমার গাল দুটো অনুরাগের রাঙা রঙে রঞ্জিত। অভিক আমার দিকে তাকিয়ে সেই মায়াবী হাসিটা হাসল—যে হাসিটা কেবল আমার জন্যই বরাদ্দ।
এক নতুন দিগন্তের পথে
দোকানের দরজাটা যখন খুললাম, বাইরের ভোরের বাতাস এসে আমাদের গায়ে লাগল। গঙ্গার ওপাড় থেকে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। অভিক ওর জিপে ওঠার আগে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। আমাদের এই গোপন ভালোবাসার সাক্ষী রইল কেবল সেই নিঃঝুম রাত আর দোকানের শীতল কুলারগুলো।
এর পর থেকে আমাদের দেখা হওয়ার মুহূর্তগুলো আরও গভীর হতে শুরু করল। কখনো গঙ্গার ঘাটে সূর্যাস্তের সময়, কখনো বা জনাকীর্ণ কফিশপে। তবে সেই প্রথম রাতের সেই অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা আমাদের সম্পর্কের ভীত গড়ে দিয়েছিল। আমি জানতাম, এই মানুষটি কেবল আমার শরীর নয়, আমার আত্মাকেও ভালোবাসে। আমাদের এই অসমবয়সী প্রেমের গল্প হয়তো সমাজ সহজে বুঝবে না, কিন্তু আমরা জানি—যেখানে সম্মান আর গভীর অনুরাগ থাকে, সেখানে জাগতিক কোনো নিয়ম কাজ করে না।
আমাদের ভালোবাসার সেই সব বিচিত্র আর রোমাঞ্চকর গল্প না হয় অন্য কোনোদিন শোনাব। আজ শুধু এইটুকুই থাক—সেই রাতের সেই অনুরাগের রেশ আমার মনে আজও অমলিন হয়ে আছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন