কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরে সময় যেন থমকে থাকে। লোহার শিকের ওপাশে আকাশটা যতটুকু দেখা যায়, সেটুকুই স্বাধীনতার একমাত্র চিলতে রোদ্দুর। নীলয়, বাইশ বছরের টগবগে যুবক, পরিস্থিতির ফেরে আজ এই চার দেয়ালের বাসিন্দা। সে কাজ করে কারাগারের সার্ভিস ডিপার্টমেন্টে। তবে এই একঘেয়ে যান্ত্রিক জীবনের মাঝেও বসন্তের বাতাসের মতো একটি নাম মিশে আছে— ‘শিখা’ (কল্পিত নাম)। শিখা এই অফিসের একজন স্টাফ।
আমাদের গল্পের শুরুটা এক বৃষ্টিভেজা বিষণ্ণ দুপুরে। বাইরের পৃথিবীর খবর তখন উত্তাল। ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তার রেশ পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। খবরের কাগজে নীলয় পড়ছিল প্যারিসের রাস্তায় পরিবেশবাদীদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের কথা, যারা আইফেল টাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে আগামীর পৃথিবীর জন্য লড়াই করছে। খবরের কাগজের অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে আসছিল নীলয়ের চোখে, তার নিজের পৃথিবীটা যেখানে সংকীর্ণ এক কুঠুরিতে বন্দি।
ঠিক তখনই শিখা ঘরে ঢুকল। পরনে তার গাঢ় নীল শাড়ি, চোখে এক অদ্ভুত মায়া। শিখার উপস্থিতি নীলয়ের মনে সবসময় এক অন্যরকম স্পন্দন তৈরি করে। আজ শিখাকে দেখে নীলয়ের মনে হলো, এই কংক্রিটের জঙ্গলে সে যেন এক জীবন্ত রূপকথা। শিখার হাতে কিছু নথিপত্র ছিল, কিন্তু তার দৃষ্টি ছিল নীলয়ের বিমর্ষ মুখের দিকে।
শিখা কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, “কী ভাবছ অত নীলয়? বাইরের পৃথিবীটার কথা?”
নীলয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ভাবছি ওই প্যারিসের কথা। আইফেল টাওয়ারের নিচে মানুষ মুক্তির গান গাইছে, আর আমি এখানে সময়ের হিসাব মেলাচ্ছি।”
শিখা টেবিলের ওপর হাত রেখে আলতো করে নীলয়ের কাঁধে হাত ছোঁয়াল। সেই স্পর্শে ছিল এক অদ্ভুত আশ্বাস। শিখার গলার স্বরটা যেন এই কর্কশ পরিবেশের একদম বিপরীত। সে বলল, “মুক্তি তো মনের ভেতরে থাকে নীলয়। তুমি চাইলেই তোমার কল্পনা দিয়ে এই দেয়াল টপকে বহু দূরে হারিয়ে যেতে পারো।”
নীলয় শিখার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল এক অপার্থিব নেশা। শিখার হাসিতে মিশে ছিল শরতের স্নিগ্ধতা। সে মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল সে কোথায় আছে। তার মনে হলো শিখার নিশ্বাস তার খুব কাছে, যেন বাতাসের প্রতিটি কণা এক গোপন ভালোবাসার কথা বলে দিচ্ছে। শিখার পরিপাটি করে সাজানো চুলগুলো কপালে এসে পড়ছে, যা দেখে নীলয়ের ইচ্ছে হলো পরম মমতায় তা সরিয়ে দিতে।
শিখা একটু হেসে বলল, “জানিস, ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে এখন অরোরা বোরিয়ালিস বা মেরুজ্যোতি দেখার সময়। কী দারুণ হতো না, যদি আমরা এখন সেখানে থাকতাম?”
নীলয় শিখার হাতে হাত রাখল। এই প্রথম। স্পর্শটা ছিল বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো। শিখা হাত সরিয়ে নিল না, বরং তার আঙ্গুলগুলো নীলয়ের আঙ্গুলের মাঝে গেঁথে নিল। কারাগারের এই ছোট অন্ধকার ঘরে তখন ফুটে উঠছে হাজারো কল্পনার ফুল। নীলয় অনুভব করল শিখার হৃদস্পন্দন। শিখা ধীরে ধীরে নীলয়ের খুব কাছে এসে তার কানে ফিসফিস করে বলল, “আমি জানি তুমি এখানে কষ্টে আছ। কিন্তু মনে রেখো, কেউ একজন আছে যে তোমার ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকবে।”
সেই মুহূর্তটা ছিল আবেগের এক চরম শিখর। কোনো কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত নয়, বরং ছিল দুটি নিঃসঙ্গ আত্মার একে অপরকে খুঁজে পাওয়ার গভীর তৃষ্ণা। নীলয় শিখার ললাটে এক আলতো চুমু আঁকল। সেই চুমুতে ছিল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর আগামী দিনের স্বপ্ন। শিখা চোখ বুজে সেই স্পর্শ অনুভব করল। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল।
বাইরে তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। যেন আকাশও তাদের এই গোপন বিরহের সাক্ষী হতে চায়। শিখা নীলয়ের বুকে মাথা রাখল। কারাগারের ইউনিফর্মের খসখসে কাপড়ের নিচে নীলয়ের হৃদপিণ্ড তখন দ্রুত তালে বাজছে। সে শিখার চিবুক তুলে ধরল। শিখার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক ম্লান হাসি।
নীলয় বলল, “শিখা, আমি যখন বের হব, আমরা কি এক নতুন জীবন শুরু করতে পারব?”
শিখা নীলয়ের চোখে চোখ রেখে বলল, “অবশ্যই নীলয়। আমরা এমন এক জায়গায় যাব যেখানে কোনো সীমানা নেই, কোনো দেয়াল নেই। হয়তো লন্ডনের টেমস নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আমরা সূর্যাস্ত দেখব, যেখানে এখনকার মতো চারিদিকে উত্তেজনার আগুন নেই, শুধু আছে শান্তি।”
হঠাৎ বারান্দায় কারও বুটের শব্দ পাওয়া গেল। নিরাপত্তারক্ষীদের টহলের সময় হয়েছে। শিখা দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে একটু দূরে সরে দাঁড়াল। তার চোখে তখনো সেই অপার্থিব ভালোবাসার রেশ। সে তার শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নিয়ে হাসিমুখে নীলয়ের দিকে তাকাল— যে হাসিতে ছিল অজস্র না বলা প্রতিশ্রুতি।
নীলয়ের এখন অন্য ডিপার্টমেন্টে বদলি হয়ে গেছে। আগের মতো আর প্রতিদিন শিখার সাথে দেখা হয় না। কিন্তু প্রতিদিন বিকেলে যখন কয়েদিদের মাঠে বের করা হয়, নীলয় দূরে শিখাকে দেখতে পায়। শিখাও তাকে দেখে হাসে, চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দেয় সে এখনো আছে।
নীলয় এখন ডায়েরি লেখে। তার ডায়েরির প্রতিটি পাতায় শিখার নাম। সে খবর রাখে কীভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের নতুন অভিবাসন নীতি নিয়ে কাজ করছে, কীভাবে বিশ্বের মানচিত্র বদলাচ্ছে। কিন্তু তার নিজস্ব মানচিত্রে শুধু একটিই গন্তব্য— শিখা।
আর মাত্র এক বছর। তারপর এই লোহার দরজা চিরতরে খুলে যাবে। নীলয় জানে, সেদিন গেটের ওপাশে একটি নীল শাড়ি পরা মেয়ে তার জন্য অপেক্ষা করবে। তারা পাড়ি দেবে এক নতুন দিগন্তে, যেখানে যুদ্ধ নেই, হিংসা নেই, শুধু আছে এক বুক ভালোবাসা আর মুক্ত আকাশ।
কারাগারের নির্জন সেলে শুয়ে নীলয় যখন চোখ বোজে, সে শুনতে পায় শিখার গলার আওয়াজ। সে দেখতে পায় আইফেল টাওয়ারের নিচে তারা দুজন হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। ভালোবাসা যেখানে অপরাধ নয়, বরং বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ। সেই দিনের অপেক্ষায় নীলয় এখন প্রতিটা রাতকে আলিঙ্গন করে। কারণ সে জানে, অন্ধকারের পরেই আসে আলো।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন