
কলকাতার উপকণ্ঠে একটি ছোট ক্যাফে ও বিলিয়ার্ড জোন। নাম 'চা কফি এবং আড্ডা'। ক্যাফেটি মূলত শ্রমজীবী মানুষ, মেকানিক এবং মাঝে মাঝে স্থানীয় যান্ত্রিক শ্রমিকদের আড্ডাস্থল। মালবিকা এই ক্যাফেটি সামলায়। লম্বা, উজ্জ্বল ফর্সা বর্ণ এবং একরাশ সোনালী আভাযুক্ত চুল নিয়ে সে যখন ক্যাফের কাউন্টারে দাঁড়ায়, বাইরের ধুলোবালি মাখা মানুষগুলোর কাছে সে যেন এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি।
মালবিকা তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী নীলাভকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। তাদের সম্পর্কের রসায়নটা বেশ অন্যরকম। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে আসা পুরুষদের ঘামের গন্ধ, মেহনতী শরীরের জেদ মালবিকাকে এক অদ্ভুত আদিম রোমাঞ্চ দেয়। সে ভালোবাসে সেই পৌরুষকে, যা ঘামের বিনিময়ে রুটি জোগাড় করে। কিন্তু তার সমস্ত রোমান্টিকতা তোলা থাকে কেবল নীলাভের জন্য।
যুদ্ধের মেঘ এবং অশান্ত সময়
গল্পের প্রেক্ষাপটটি যখন তৈরি হচ্ছে, তখন বিশ্ব রাজনীতি উত্তাল। সংবাদপত্রের পাতায় আর টেলিভিশনের স্ক্রিনে কেবল একটিই খবর—ইরান ও আমেরিকার যুদ্ধ। ভারত থেকে এক দেশ পেরোলেই মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে তখন আগুনের খেলা চলছে। এই যুদ্ধের প্রভাব মালবিকার জীবনেও পড়ছে, কারণ তার ভাই ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত এবং সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে গোটা দেশ উদ্বিগ্ন।
টিভি স্ক্রিনে ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে: "ইরানের আকাশসীমায় মার্কিন বিমানবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।" সংবাদে বলা হচ্ছে, ইরানের পুরোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে আমেরিকার অত্যাধুনিক স্টেলথ ফাইটার এবং ড্রোনগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছে। মার্কিন এয়ারফোর্সের এই অভাবনীয় পরাজয় বিশ্বজুড়ে এক অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই যুদ্ধের আঁচ মালবিকার ক্যাফেতেও এসে লাগে। এখানে আসা ইঞ্জিনিয়ার এবং মেকানিকরা উত্তেজিত হয়ে আলোচনা করে কীভাবে প্রযুক্তির লড়াইয়ে দাবার চাল উল্টে যাচ্ছে।
মালবিকা যখন কাউন্টারে কফি বানায়, তখন তার কানে আসে যুদ্ধের ভয়াবহতা। সে ভাবে, ক্ষমতার এই লড়াইয়ে কত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। এই অস্থিরতার মধ্যে তার কেবল মনে পড়ে নীলাভের কথা। সকালে স্নান সেরে বেরোনোর সময় নীলাভ যখন তাকে নিবিড় করে জড়িয়ে ধরেছিল, সেই স্পর্শটা তার শরীরে এখনও লেগে আছে। নীলাভের আদরের সেই স্মৃতি তাকে সারাটা দিন এক অদ্ভুত উষ্ণতায় আচ্ছন্ন করে রাখে।
সেই শুক্রবারের রাত
শুক্রবার মানেই ক্যাফেতে উপচে পড়া ভিড়। স্থানীয় কারখানার শ্রমিকদের আজ মাইনে হয়েছে। গুমোট গরমে সবাই ক্লান্ত, কিন্তু পকেটে টাকা থাকায় মেজাজ ফুরফুরে। কেউ তাকে বলছে, "মালবিকা দিদি, আপনার হাতের কফি খেলে সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে যায়।" কেউ আবার একটু বাড়িয়ে বলে, "আপনার ওই হাসির জন্য আমি রোজ ডাবল শিফট করতে পারি।"
মালবিকা কেবল মৃদু হাসে। সে জানে এই মানুষগুলো তাকে শ্রদ্ধা করে, কিন্তু তাদের চোখের তৃষ্ণা সে বুঝতে পারে। রাত যত বাড়ছে, মালবিকার অস্থিরতা তত বাড়ছে। সে আজ নীলাভের জন্য অপেক্ষা করছে। ক্যাফের নীল রঙের পুল টেবিলটা ঘরের এক কোণে পড়ে আছে। বাইরের উত্তপ্ত পরিবেশের সাথে তার শরীরের ভেতর এক গোপন দহন শুরু হয়েছে। সে ভাবছে নীলাভের বলিষ্ঠ হাত দুটোর কথা, যা তাকে আগলে রাখে।
রাত এগারোটা বাজে। মালবিকা সবাইকে বিদায় দিয়ে 'লাস্ট কল' ঘোষণা করল। একে একে সবাই চলে গেল। ক্যাফের ঝাপসা আলোয় কেবল সে একা। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।
ভেতরে ঢুকল নীলাভ। মালবিকা চাইল একটু খেলা করতে। সে যেন তাকে চেনেই না। নীলাভ কাউন্টারে এসে বসল। তার চোখে এক দুষ্টুমি ভরা চাউনি।
মালবিকা পেশাদার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, "কি দেব আপনার জন্য? ক্যাফে তো বন্ধ হওয়ার সময় হয়ে এসেছে।"
নীলাভ তার গভীর স্বরে উত্তর দিল, "আমি অনেক দূর থেকে এসেছি সেই স্বাদ নিতে, যা কেবল তোমার কাছেই পাওয়া যায়।"
মালবিকার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। নীলাভ উঠে এসে তার হাতটা ধরল। মালবিকা দৌড়ে গিয়ে ক্যাফের সদর দরজাটা বন্ধ করে দিল। বাইরের পৃথিবীর যুদ্ধ, ইরানের মরুভূমিতে ভেঙে পড়া মার্কিন যুদ্ধবিমান, তেলের দাম—সব কিছু যেন মুহূর্তেই অর্থহীন হয়ে গেল। এই ছোট ঘরে এখন কেবল দুজন মানুষ আর এক সমুদ্র ভালোবাসা।
পুল টেবিলের সেই মুহূর্ত
নীলাভ মালবিকাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। মালবিকা তার দুহাতে নীলাভের গলা জড়িয়ে ধরল। তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল ক্যাফের সেই নীল মখমলে ঢাকা পুল টেবিলটার দিকে। টেবিলের ওপরের মৃদু আলো তাদের ছায়াকে দীর্ঘ করে তুলছিল।
নীলাভ মালবিকাকে টেবিলের ওপর বসিয়ে দিল। মালবিকা অনুভব করছিল নীলাভের শরীরের তপ্ত নিঃশ্বাস। সে নীলাভের শার্টের বোতামগুলো খুলতে শুরু করল। নীলাভের সুগঠিত বুক আর পেশিবহুল শরীরের ঘাম মালবিকাকে এক অদ্ভুত মাদকতায় ডুবিয়ে দিল।
নীলাভ তার ঠোঁট ডুবিয়ে দিল মালবিকার ঘাড়ে, কাঁধে। মালবিকা চোখ বুজে সেই স্পর্শ অনুভব করছিল। তাদের প্রেম কেবল শারীরিক তৃপ্তি ছিল না, তা ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার এক পরম মিলন। পুল টেবিলের শক্ত কাঠামো আর মখমলের নরম ছোঁয়া—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব কাব্য তৈরি হচ্ছিল।
বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ক্যাফের ভেতর টুপটাপ শব্দের বদলে কেবল দুজনের দ্রুততর হতে থাকা শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। নীলাভ তাকে জড়িয়ে ধরে যখন আদরের চূড়ান্ত শিখরে নিয়ে যাচ্ছিল, মালবিকা বুঝতে পারছিল জীবনের শ্রেষ্ঠ যুদ্ধটা আসলে ভালোবাসার, যেখানে পরাজয় মানেই জয়।
পরের সকাল ও একটি অমলিন হাসি
পরদিন সকালে ক্যাফের মালিক মিস্টার চ্যাটার্জি যখন দোকানে এলেন, তিনি দেখলেন পুল টেবিলের নীল মখমলে একটা বড় জলের দাগ। তিনি অবাক হয়ে মালবিকাকে জিজ্ঞেস করলেন, "কী ব্যাপার মালবিকা? ছাদ থেকে জল পড়ছে নাকি? পুল টেবিলে এই দাগটা কিসের?"
মালবিকা ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি চেপে রাখল। সে জানত, এই দাগটা কেবল জলের নয়, এটা একটা দীর্ঘ রাতের রোমান্টিক মহাকাব্যের স্বাক্ষর। সে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, "কাকু, কাল রাতে খুব ঝড়-বৃষ্টি হয়েছিল তো, হয়তো জানলার ফাঁক দিয়ে একটু জল চলে এসেছে। আপনি চিন্তা করবেন না, আমি পরিষ্কার করে দেব।"
সে যখন টেবিলটা মুছছিল, তার মনে পড়ছিল নীলাভের সেই বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শ আর তাদের একসাথে দেখা স্বপ্নগুলো। দূরে কোথাও রেডিওতে খবর পড়ছিল—ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল। কিন্তু মালবিকার মনে হলো, পৃথিবীর সব যুদ্ধ থেমে যেতে পারে, যদি মানুষ কেবল একবার এই ভালোবাসার স্বাদ পায়।
পুল টেবিলের সেই কিউ বা লাঠিটা একপাশে হেলান দিয়ে রাখা ছিল। মালবিকা মনে মনে ভাবল, জীবনের আসল খেলাটা তো টেবিলের ওপরে নয়, হৃদয়ের গভীরে খেলা হয়। আর সেই খেলায় সে এবং নীলাভ দুজনেই বিজয়ী।
(গল্পটি এখানেই শেষ হলেও মালবিকা আর নীলাভের ভালোবাসা এক চিরন্তন আখ্যান হয়ে রয়ে গেল ক্যাফের সেই নিভৃত কোণে।)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন