
এক দীর্ঘ রোমান্টিক বাংলাদেশি প্রেমকাহিনি
ঢাকার ব্যস্ত শহরটা যেন কখনো ঘুমায় না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু গাড়ির হর্ন, মানুষের ভিড় আর ধোঁয়ায় ঢাকা আকাশ। কিন্তু এই কোলাহলের মাঝেও কিছু মানুষ থাকে, যাদের হৃদয়ে লুকিয়ে থাকে এক টুকরো নীল আকাশ, কিছু স্বপ্ন আর এক চিলতে শান্তির খোঁজ।
আমি অনিন্দিতা। বয়স চব্বিশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী। বই, কবিতা আর প্রকৃতি—এই তিনটাই আমার পৃথিবী। শহরের এই যান্ত্রিক জীবনে আমি সবসময় খুঁজে ফিরতাম একটু মুক্ত বাতাস, একটু নির্জনতা। আর সেই খোঁজের মাঝেই আমার জীবনে এসেছিল নীলান্ত।
নীলান্ত ছিল একেবারে অন্যরকম। ওর চোখে সবসময় একটা শান্ত নীল আকাশের ছায়া দেখা যেত। ঢাকার কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত, কিন্তু অফিসের হিসেবি জীবনের বাইরেও ওর একটা আলাদা জগৎ ছিল—বাইক, নদী, গ্রামবাংলার পথ আর স্বাধীনতা।
আমাদের পরিচয় হয়েছিল বইমেলায়।
সেদিন ফেব্রুয়ারির শেষ বিকেল। চারদিকে বইয়ের গন্ধ, মানুষের ভিড়, আর মৃদু বসন্তের বাতাস। আমি জীবনানন্দ দাশের কবিতার বই উল্টে দেখছিলাম। হঠাৎ পাশ থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
“আপনি কি জীবনানন্দ পড়েন?”
আমি তাকিয়ে দেখি, লম্বা গড়নের এক ছেলে, চোখে গোল ফ্রেমের চশমা, মুখে মৃদু হাসি।
আমি হেসে বলেছিলাম,
“পড়ি না, ভালোবাসি।”
ওর চোখে তখন এক ঝলক বিস্ময় নেমে এসেছিল।
সেই প্রথম কথা। তারপর ধীরে ধীরে সম্পর্ক। প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর এক অদ্ভুত টান। যেন বহুদিন ধরে চেনা দুটো আত্মা হঠাৎ একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে।
মে মাসের এক দুপুর।
গরমটা সেদিন একটু বেশিই ছিল। কিন্তু বাতাসে ছিল বসন্তের শেষ ছোঁয়া। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। হালকা হলুদ রঙের সালোয়ার কামিজ পরে চুলগুলো খোলা রেখেছিলাম। দূরে কৃষ্ণচূড়া গাছের লাল ফুলগুলো রোদের আলোয় জ্বলছিল।
ঠিক তখনই নিচে বাইকের শব্দ শুনলাম।
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
বারান্দা থেকে নিচে তাকিয়ে দেখি, নীলান্ত দাঁড়িয়ে আছে। কালো টি-শার্ট, জিন্স আর মুখে সেই চেনা হাসি।
ও মাথা তুলে বলল,
“চলো?”
আমি নিচে নেমে এলাম। মা ভেবেছিলেন আমি বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছি। আসলে আজকের পুরো দিনটা আমি শুধু নীলান্তর জন্য রেখে দিয়েছিলাম।
বাইকের পেছনে বসতেই ও বলল,
“আজ তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব।”
“কোথায়?”
“যেখানে গেলে শহরের কথা ভুলে যাবে।”
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি।
ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে আমরা যখন শহরের বাইরে বের হলাম, তখন যেন পৃথিবীটাই বদলে গেল। চারদিকে সবুজ ধানক্ষেত, দূরে তালগাছ, আর মাঝেমধ্যে ছোট ছোট গ্রাম।
বাতাস তখন অনেক ঠান্ডা লাগছিল।
আমি ধীরে ধীরে নীলান্তর পিঠে মাথা রাখলাম।
বাইক দ্রুত গতিতে ছুটছিল। রাস্তার দুপাশের গাছগুলো পেছনে হারিয়ে যাচ্ছিল। আমার ওড়নাটা বাতাসে উড়ছিল, আর চুলগুলো বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছিল।
নীলান্ত এক হাত দিয়ে আমার হাত চেপে ধরল।
“ভয় লাগছে?”
আমি মৃদু হেসে বললাম,
“না। তোমার সাথে থাকলে কখনো ভয় লাগে না।”
ও কিছু বলল না। শুধু বাইকের গতি একটু কমিয়ে দিল।
আমরা মুন্সিগঞ্জের দিকের এক গ্রামীণ এলাকায় চলে এসেছিলাম। রাস্তা তখন সরু হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে ইটের পথ, আবার কোথাও কাঁচা রাস্তা।
চারদিকে এত সবুজ ছিল যে মনে হচ্ছিল আমরা কোনো ছবির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি।
একসময় নীলান্ত বাইক থামাল।
আমি নেমে চারদিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
একটা বিশাল বটগাছ। তার নিচে ছায়াঘেরা জায়গা। পাশে ছোট্ট একটা পুকুর, যেখানে শাপলা ফুটে আছে। বাতাসে কাঁচা ঘাসের গন্ধ।
দূরে কয়েকটা গরু চরছে।
পুরো জায়গাটা এত শান্ত ছিল যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছিল।
আমি আস্তে করে বললাম,
“এটা যেন স্বপ্নের মতো…”
নীলান্ত আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
“জানতাম তোমার ভালো লাগবে।”
আমরা গাছের নিচে গিয়ে বসলাম।
নীলান্ত একটা ছোট চাদর বের করে ঘাসের ওপর বিছিয়ে দিল। আমি বসতেই ও পাশে এসে হেলান দিল গাছের গুঁড়িতে।
উপরে পাতার ফাঁক দিয়ে রোদের আলো এসে পড়ছিল আমার মুখে।
ও তাকিয়ে ছিল আমার দিকে।
আমি একটু লজ্জা পেয়ে বললাম,
“এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”
নীলান্ত ধীরে বলল,
“তোমাকে দেখলে মনে হয় বসন্ত মানুষের রূপ নিয়ে আমার সামনে বসে আছে।”
আমার গাল লাল হয়ে উঠল।
আমি চোখ নামিয়ে ফেললাম।
বাতাসে তখন কোকিলের ডাক ভেসে আসছিল।
একসময় আমি ওর হাতটা নিজের হাতে নিলাম।
নীলান্ত আমার আঙুলের ওপর আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।
“অনিন্দিতা…”
“হুম?”
“কখনো আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না তো?”
প্রশ্নটা শুনে আমি অবাক হলাম।
“এমন কথা বলছো কেন?”
ও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
“জীবনে অনেক মানুষ এসেছে, আবার হারিয়েও গেছে। কিন্তু তোমাকে হারানোর ভয়টা আলাদা।”
আমি ওর দিকে তাকালাম।
সেই চোখে কোনো অভিনয় ছিল না। ছিল শুধু গভীর ভালোবাসা।
আমি আস্তে করে ওর কাঁধে মাথা রাখলাম।
“আমি কোথাও যাব না।”
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে লাগল।
আমরা পুকুরপাড়ে হাঁটতে শুরু করলাম।
ঘাসগুলো নরম ছিল। মাঝে মাঝে বাতাসে আমার চুল উড়ে গিয়ে নীলান্তর মুখে লাগছিল।
ও হেসে বলল,
“তোমার চুলের সাথে যুদ্ধ করতে করতে একদিন আমি হার মেনে যাব।”
আমি হেসে ফেললাম।
“তবুও তো ছাড়ো না।”
“সব সুন্দর জিনিসই একটু ঝামেলা নিয়ে আসে।”
ওর কথায় আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
হঠাৎ দূরে কালো মেঘ জমতে শুরু করল।
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম,
“বৃষ্টি হবে মনে হয়।”
নীলান্ত হাসল।
“বৃষ্টি হলে সমস্যা কী?”
“ভিজে যাব।”
“তোমাকে বৃষ্টিতে দেখতে আমার খুব ইচ্ছে করে।”
আমি চোখ ছোট করে বললাম,
“তুমি খুব দুষ্ট।”
ও মৃদু হেসে কাছে এগিয়ে এলো।
“শুধু তোমার জন্য।”
কিছুক্ষণ পর সত্যিই বৃষ্টি নামল।
প্রথমে হালকা, তারপর ধীরে ধীরে ঝুম।
আমরা বটগাছের নিচে আশ্রয় নিলাম। কিন্তু বাতাসের সাথে বৃষ্টির ফোঁটা এসে আমাদের ভিজিয়েই দিচ্ছিল।
আমার চুল ভিজে কপালে লেগে গিয়েছিল।
নীলান্ত তাকিয়ে ছিল।
আমি বললাম,
“কি?”
ও ধীরে হাত বাড়িয়ে আমার কপাল থেকে চুল সরিয়ে দিল।
সেই স্পর্শে আমার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।
বৃষ্টির শব্দে চারপাশ ভরে গিয়েছিল। পুকুরের জলে গোল গোল বৃত্ত তৈরি হচ্ছিল।
নীলান্ত আস্তে করে বলল,
“এই মুহূর্তটা যদি থেমে যেত…”
আমি চুপ করে রইলাম।
কারণ আমারও ঠিক একই অনুভূতি হচ্ছিল।
বৃষ্টি থামার পর চারপাশ আরও সুন্দর হয়ে উঠল।
মাটির গন্ধ বাতাসে মিশে ছিল।
আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। দূরে একটা সরু বাঁশের সাঁকো দেখা যাচ্ছিল।
নীলান্ত বলল,
“চলো ওপারে যাই।”
আমি একটু ভয় পেলাম।
“আমি পড়ে যাব।”
“আমি আছি তো।”
ও হাত বাড়িয়ে দিল।
আমি ওর হাত ধরে সাঁকোর ওপর উঠলাম।
সাঁকোটা দুলছিল। আমি ভয় পেয়ে শক্ত করে নীলান্তর হাত চেপে ধরলাম।
ও হেসে বলল,
“এত ভয়?”
“আমি ছোটবেলা থেকেই এসব ভয় পাই।”
“তাহলে আজ ভয় কাটাও।”
আমি ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম।
মাঝপথে গিয়ে হঠাৎ পা পিছলে গেল।
আমি চমকে উঠতেই নীলান্ত আমাকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে নিল।
এক মুহূর্তের জন্য আমি ওর বুকের সাথে মিশে গেলাম।
আমাদের চোখ এক হয়ে গেল।
চারপাশে তখন শুধু বাতাসের শব্দ।
আমার বুকের ধুকপুকানি যেন ও শুনতে পাচ্ছিল।
নীলান্ত খুব আস্তে বলল,
“তুমি জানো, তোমাকে ছাড়া আমার পৃথিবীটা অসম্পূর্ণ লাগে?”
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
শুধু ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
বিকেলের শেষ আলো তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
আমরা আবার বটগাছের নিচে ফিরে এলাম।
নীলান্ত ব্যাগ থেকে দুটো কাগজের কাপ বের করল।
“চা?”
আমি অবাক হলাম।
“তুমি চা এনেছো?”
“তোমার সাথে বিকেল কাটাব আর চা থাকবে না?”
আমি হেসে কাপটা নিলাম।
গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের সাথে সেই গ্রামের বিকেলটা যেন আরও সুন্দর হয়ে উঠল।
আমরা অনেক কথা বললাম।
ভবিষ্যৎ নিয়ে।
স্বপ্ন নিয়ে।
নীলান্ত বলল,
“আমি একটা ছোট বাড়ি চাই। শহরের বাইরে। চারপাশে গাছ থাকবে।”
আমি বললাম,
“আর একটা ছোট লাইব্রেরি।”
“আর বারান্দায় তুমি বসে বই পড়বে।”
“আর তুমি?”
“আমি তোমাকে দেখব।”
আমি হেসে ফেললাম।
“সবসময়?”
“হ্যাঁ। কারণ কিছু মানুষকে দেখলে কখনো ক্লান্তি আসে না।”
সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল।
আকাশ কমলা আর লাল রঙে ভরে উঠেছিল।
আমরা ফেরার প্রস্তুতি নিলাম।
আমি শেষবারের মতো চারদিকে তাকালাম।
মনে হচ্ছিল এই জায়গাটা আমাদের ভালোবাসার একটা গোপন আশ্রয় হয়ে থাকবে।
বাইকে ওঠার আগে নীলান্ত হঠাৎ আমার হাত ধরল।
“অনিন্দিতা?”
“হুম?”
“আজকের দিনটা মনে থাকবে?”
আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,
“এই দিনটা কোনোদিন ভুলতে পারব না।”
ফেরার পথে বাতাসটা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।
আমি এবার আরও শক্ত করে নীলান্তকে জড়িয়ে ধরলাম।
রাস্তার দুপাশে তখন সন্ধ্যার আলো জ্বলছে। দূরে গ্রামের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল।
সেই শব্দ, সেই বাতাস, সেই পথ—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন এক জীবন্ত কবিতা হয়ে উঠেছিল।
নীলান্ত আস্তে করে বলল,
“একদিন যদি আমরা সত্যিই হারিয়ে যেতে পারতাম এইসব গ্রামের পথে…”
আমি চোখ বন্ধ করে বললাম,
“তাহলে হয়তো পৃথিবীটা আরও সুন্দর হতো।”
ঢাকায় ফিরে আসতে রাত হয়ে গেল।
শহরের আলো, গাড়ির শব্দ, ব্যস্ততা—সব আবার আগের মতো।
কিন্তু আমার ভেতরে কিছু একটা বদলে গিয়েছিল।
সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
দূরে একফালি চাঁদ।
আমার চুলে তখনও গ্রামের বাতাসের গন্ধ লেগে ছিল।
মনে হচ্ছিল আমি এখনও সেই বটগাছের নিচে বসে আছি, পাশে নীলান্ত, সামনে সবুজ প্রান্তর।
জীবনে অনেক দিন আসে, আবার হারিয়ে যায়।
কিন্তু কিছু দিন থাকে, যেগুলো হৃদয়ের গভীরে চিরকাল বেঁচে থাকে।
আমাদের সেই বসন্তের দিনটা ছিল ঠিক তেমনই।
নীল আকাশ, দখিনা বাতাস, বাইকের গতি আর দুটো মানুষের নিঃশব্দ ভালোবাসা—সব মিলিয়ে সেই দিনটি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর কবিতা হয়ে রয়ে গেল।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন