বৃষ্টিভেজা বিকেলে
জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন তাল দিচ্ছে বাইরের কোলাহলমুখর শহরের সাথে। শ্রাবণের এই পড়ন্ত বিকেলে মায়াবী আলোয় ভেসে যাচ্ছে বসার ঘরটি। কফি মগের উষ্ণতা হাতে নিয়ে সোফায় বসে আনমনে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল নিলয়। ঠিক এই মুহূর্তে তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে নীলার মুখটা।
নিলয়ের বয়স এখন চল্লিশ ছুঁইছুঁই। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে সবেমাত্র অবসর নিয়েছে। দীর্ঘ বিশ বছরের সুশৃঙ্খল এবং কঠোর জীবনযাপনের পর এখনকার অবসর যেন তাকে কিছুটা থিতু হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ছয় ফুট লম্বা, একশ নব্বই পাউন্ড(86 kg) ওজনের নিলয় হয়তো রূপকথার কোনো রাজপুত্র নয়, কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব আর আন্তরিকতার মাঝে এক অদ্ভুত আকর্ষণ রয়েছে। জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে নানা মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে, কিন্তু গত চার বছর ধরে নীলা তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
নীলার বয়স এখন ছত্রিশ। একজন আধুনিক ও রুচিশীল নারী। তার গায়ের রঙ উজ্জ্বল, কাঁধ পর্যন্ত ছড়ানো ঢেউ খেলানো চুল আর গভীর কালো চোখ যেন যেকোনো মানুষের নজর কাড়তে বাধ্য। সে সপ্তাহের তিন দিন জিমে যায়, নিজের ফিটনেস নিয়ে সচেতন। তার সাজ-পোশাক সবসময়ই মার্জিত ও আকর্ষণীয়। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, নীলা যখন শাড়ি বা হালকা কোনো দেশি পোশাকে তার লম্বা ও আকর্ষণীয় গড়ন ফুটিয়ে তোলে, তখন নিলয় নিজের অজান্তেই তার প্রেমে আরও একবার পড়ে যায়।
দুজনার বোঝাপড়াটা এত চমৎকার যে, তারা একে অপরের সাথে সব ধরনের কথা শেয়ার করতে পারে। তাদের ভালোবাসার গভীরতা শুধু শারীরিক আকর্ষণের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মনস্তাত্ত্বিক এবং আবেগীয় এক মেলবন্ধন।
দূরত্বের দিনগুলো
কয়েক দিন আগের কথা। নিলয়কে পারিবারিক প্রয়োজনে কিছুদিন ঢাকার বাইরে যেতে হয়েছিল, কুড়িগ্রামের দেশের বাড়িতে। শনিবার থেকে বুধবার—এই পাঁচটা দিন যেন কাটতেই চাইছিল না। প্রতি রাতে নিলয় যখন হোটেল থেকে নীলাকে ফোন করত, দুজনেই বুঝতে পারত কতটা তীব্র তাদের ভালোবাসা।
"আজ তোমাকে খুব মিস করছি, নিলয়," নীলার মিষ্টি কণ্ঠস্বর ভেসে আসত ফোনের ওপাশ থেকে। "মনে হয় তুমি আমার পাশেই আছো।"
"আমিও নীলা," নিলয়ের কণ্ঠেও একই আকুলতা থাকত। "খুব দ্রুত ফিরে আসছি। এই কটা দিন যেন মনে হচ্ছে অনেক সময়।"
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরও তাদের কথা হতো। নীলা তার সন্তানের স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি সেরে নিলয়ের সাথে কথা বলত, আর নিলয় তাকে প্রতিটি ছোটখাটো বিষয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করত। এই দূরত্বের দিনগুলো তাদের ভালোবাসাকে আরও অনেক বেশি তীব্র করে তুলেছিল।
বুধবার দুপুরে নিলয় যখন ঢাকায় ফিরল, তখন আকাশটা মেঘলা। নিলয় এয়ারপোর্ট থেকে সোজা অফিসে যাওয়ার কথা ভেবেছিল, কিন্তু নীলা নিজেই গাড়ি চালিয়ে তাকে রিসিভ করতে চলে এসেছিল।
গাড়ির ভেতর সেই বিশেষ মুহূর্ত
"কেমন কাটল দিনগুলো?" গাড়ি চালানোর সময় নীলা নিলয়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করল।
"ভালো, তবে তোমাকে ছাড়া একদম ভালো কাটেনি," নিলয়ের মুখে তৃপ্তির হাসি।
নীলা এক হাত দিয়ে নিলয়ের হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল। তার হাতের উষ্ণতা নিলয়ের মনের সব ক্লান্তি দূর করে দিল। তারা যখন নিলয়ের অফিসের নিচে আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিংয়ে পৌঁছাল, তখন ঘড়িতে দেখা গেল অফিসে যাওয়ার জন্য এখনও পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাকি। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
"আজ অনেক দিন পর দেখা," নীলা গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে বলল। "চলুন না, কিছু সময় একসাথে কাটানো যাক।"
তারা দুজনেই গাড়ির পেছনের সিটে এসে বসল। বাইরের বৃষ্টির শব্দ আর গাড়ির ভেতরের নিস্তব্ধতা এক অদ্ভুত রোমান্টিক পরিবেশ তৈরি করল। নীলা নিলয়ের কাঁধে মাথা রাখল। তার চুলের মিষ্টি সুবাস নিলয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলল। নিলয় নীলার কপালে আলতো করে চুমু খেল।
"আমি ভেবেছিলাম শুধু গল্প করেই সময় কাটাব," নিলয় নীলার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল।
"কিন্তু আমার মন যে মানছে না," নীলা মুচকি হেসে নিলয়ের বুকে হাত রাখল। তার নরম হাতের স্পর্শে নিলয়ের হৃদয় কেঁপে উঠল।
তারা একে অপরের বাহুডোরে আবদ্ধ হলো। নীলা তার নরম হাত দিয়ে নিলয়ের পিঠ ছুঁয়ে দিল, আর নিলয় নীলার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। তাদের এই ছোটখাটো রোমান্টিক খুনসুটি আর ভালোবাসা যেন মুহূর্তের মধ্যে তাদের চারপাশের জগতকে ভুলিয়ে দিল।
আবেগের গভীরতা
"তুমি জানো নিলয়, এই চার বছরে তোমাকে যতটা আপন করে পেয়েছি, এতটা আগে কখনও কাউকে ভাবিনি," নীলা তার গভীর কালো চোখে নিলয়ের দিকে তাকিয়ে বলল।
নিলয় নীলার হাত দুটি নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলল, "তুমি আমার জীবনে আসার পর সবকিছু অনেক সুন্দর হয়ে গেছে, নীলা। আমাদের এই পথচলা যেন কখনো শেষ না হয়।"
গাড়ির কাচগুলো বাইরের বৃষ্টির ঠান্ডা আবহাওয়ায় বাষ্পে ঢেকে গিয়েছিল। তারা যেন বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে এক অন্য জগতে হারিয়ে গিয়েছিল। নীলার উপস্থিতি নিলয়ের কাছে এক পরম শান্তির মতো।
নিলয় নীলার হাত ধরে কপালে ঠেকিয়ে বলল, "তোমার এই হাসির জন্যই আমি যেকোনো দূরত্ব পেরিয়ে আসতে পারি।"
নীলা নিলয়ের বুকে আরও একটু চেপে বসল। তাদের হৃদস্পন্দনের আওয়াজ যেন গাড়ির ভেতরের পিনপতন নীরবতাকে ভেঙে দিচ্ছিল। তারা একে অপরের প্রতি এতটাই নিবেদিতপ্রাণ যে, কথার চেয়েও তাদের নীরবতা অনেক বেশি কথা বলছিল।
ভালোবাসার নতুন অধ্যায়
বাইরে বৃষ্টি তখনও থামেনি, বরং আরও জোরেশোরে পড়ছে। গাড়ির ভেতরে তারা দুজন বসে আছে পরম নির্ভরতায়। নিলয় নীলাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "তাহলে চলো, আগামী ছুটির দিনে আমরা কোথাও ঘুরে আসি। শুধু তুমি আর আমি।"
নীলা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল, "হ্যাঁ, নিশ্চয়ই! কক্সবাজারের সেই সমুদ্রসৈকতটা কেমন হয়?"
"দারুণ হবে," নিলয় সম্মতি জানিয়ে নীলার চুলে আরও একবার হাত বুলাল।
কিছু সময় এভাবে কাটানোর পর, যখন নিলয়ের অফিসে যাওয়ার সময় হলো, তখন তারা দুজনেই নিজেদের গুছিয়ে নিল। নীলা নিলয়কে অফিসের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিল। যাওয়ার আগে নীলা নিলয়ের গালে আলতো করে একটি চুমু এঁকে দিল।
নিলয় অফিসে ঢোকার সময় বারবার পেছনে ফিরে নীলার দিকে তাকাচ্ছিল। নীলা তখনো গাড়ির জানালা থেকে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছিল। সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলে নীলার এই অমলিন হাসি নিলয়ের মনের মণিকোঠায় চিরকাল রয়ে গেল।
উপসংহার
জীবনে চলার পথে কত মানুষই তো আসে, কিন্তু সত্যিকারের সঙ্গী খুঁজে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। নিলয় ও নীলার এই ছোট্ট কিন্তু রোমান্টিক গল্পটি প্রমাণ করে যে, ভালোবাসা কোনো বয়সের বা দূরত্বের গণ্ডি মানে না। তা শুধু বিশ্বাস, সম্মান এবং পারস্পরিক অনুভূতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন