সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গতির নেশা ও হৃদয়ের টান | এক পুলিশ অফিসার ও স্ত্রীর গভীর রোমান্টিক প্রেমের গল্প

গতির নেশা ও হৃদয়ের টান

পুলিশ অফিসার স্বামী ও স্ত্রীর গভীর রোমান্টিক মুহূর্তের বাংলা প্রেমের গল্প
ভালোবাসা কখনো গতির মতো উন্মাদ, কখনো ভোরের মতো শান্ত।

আমি অনন্যা। ছোটবেলা থেকেই আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ছিল আমার চুল। মা বলতেন, আমার চুল নাকি ঠিক বর্ষার রাতের মতো—ঘন, গভীর আর রহস্যময়। স্কুলে পড়ার সময় বান্ধবীরা আমার চুল ছুঁয়ে দেখত, পার্লারে গেলে সবাই জিজ্ঞেস করত কোন তেল ব্যবহার করি। কিন্তু আমার চুলের সবচেয়ে বড় ভক্ত ছিল একজন মানুষ—আমার স্বামী অভীক।

অভীক যখন প্রথম আমাকে দেখেছিল, তখনই নাকি আমার চোখের চেয়ে আগে ওর নজর গিয়েছিল আমার চুলে। ও মাঝেমধ্যে মজা করে বলে, “তোমার চুলের ভেতরেই বুঝি আমি আমার পুরো পৃথিবী খুঁজে পাই।”

আমি তখন হেসে বলি, “তাহলে সাবধানে থেকো, এই পৃথিবীতে হারিয়ে যেও না যেন!”

ও আমাকে জড়িয়ে ধরে উত্তর দেয়, “তোমার মাঝে হারিয়ে যাওয়ার মতো সুখ আর কোথাও নেই।”

অভীক পেশায় একজন পুলিশ অফিসার। দায়িত্ববান, গম্ভীর আর সাহসী। কিন্তু ইউনিফর্মের কঠিন মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অসম্ভব কোমল মানুষ। ওর দিনগুলো কাটে অপরাধী ধরা, কেস সামলানো আর শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্যে। আর রাতের শেষে যখন ও বাড়ি ফেরে, তখন মনে হয় যেন যুদ্ধ শেষে কোনো ক্লান্ত সৈনিক নিজের আশ্রয়ে ফিরেছে।

আমাদের বিয়ে হয়েছে তিন বছর। এই তিন বছরে আমরা অনেক ঝগড়া করেছি, অনেক অভিমান হয়েছে, আবার সেই অভিমান ভাঙিয়ে রাতভর গল্পও করেছি। কিন্তু একটা জিনিস কখনো বদলায়নি—আমাদের একে অপরের প্রতি টান।

সেদিন ছিল আমার কলেজের সবচেয়ে কাছের বান্ধবী তিথির ব্যাচেলোরেট পার্টি। অনেকদিন পর সব বন্ধু একসাথে হব, সেই উত্তেজনাতেই সকাল থেকে মনটা ভালো ছিল। অভীক তখন ডিউটিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইউনিফর্ম পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বেল্ট ঠিক করছিল।

আমি বিছানায় বসে ওকে দেখছিলাম। পুলিশের পোশাকে ওকে ভীষণ মানায়। যেন সিনেমার কোনো নায়ক।

আমি হেসে বললাম, “আজকে কিন্তু আমাকে মিস করবে।”

অভীক আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “অসম্ভব। তোমাকে ছাড়া আমার এক ঘণ্টাও ভালো লাগে না।”

“তাহলে পার্টিতে যাই না?”

“না, না। তুমি যাও। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাও। তবে…”

“তবে কী?”

ও কাছে এসে আমার কানের পাশে মুখ নামিয়ে বলল, “ওই ছোট কালো ড্রেসটা পরো না।”

আমি হেসে ফেললাম। “কেন?”

“কারণ ওই ড্রেসে তোমাকে দেখলে অন্য পুরুষদের চোখ আমি সহ্য করতে পারি না।”

“আপনি তো বেশ পজেসিভ অফিসার!”

ও আমার কোমরে হাত রেখে বলল, “তোমার ব্যাপারে আমি সবসময় পজেসিভ।”

আমি ইচ্ছে করেই ওকে একটু উত্যক্ত করলাম। “তাহলে আজ সেটাই পরব।”

অভীক গভীরভাবে আমার দিকে তাকাল। “ঠিক আছে। কিন্তু রাতে ফিরে এসে আমাকে তার শাস্তি দিতে হবে।”

ওর চোখের চাহনি দেখে আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল।

বিকেলের দিকে আমি তৈরি হতে শুরু করলাম। কালো ছোট ড্রেসটা পরতেই আয়নায় নিজেকে নতুন লাগছিল। চোখে হালকা স্মোকি মেকআপ, ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। কিন্তু সবকিছুর শেষে আমি চুল খুলে দিলাম। কোমর ছুঁয়ে নামা চুলগুলো যেন পুরো সাজের প্রাণ হয়ে উঠল।

আমি যখন বের হচ্ছিলাম, অভীক তখন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। ও কিছুক্ষণ চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

“এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

ও ধীরে ধীরে বলল, “তুমি আজ ভয়ংকর সুন্দর লাগছ।”

“ভয়ংকর?”

“হ্যাঁ। কারণ তোমাকে দেখলে মনে হয় পৃথিবীর সবকিছু ছেড়ে শুধু তোমার দিকেই তাকিয়ে থাকি।”

আমি হেসে ওর গালে চুমু খেলাম। “ডিউটিতে মন দাও অফিসার।”

কলকাতার সেই নামী ক্লাবটা আলো আর শব্দে যেন অন্য এক পৃথিবী হয়ে উঠেছিল। ভেতরে ঢুকতেই চারপাশে উন্মাদনা। ডিজের তালে তালে সবাই নাচছে, হাসছে, চিৎকার করছে। তিথি এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল।

“উফ! অনন্যা, তুই আজ একদম সিনেমার নায়িকা লাগছিস!”

আমি হাসলাম। “তোর দিন আজ, আমার না।”

আমরা সবাই মিলে ছবি তুললাম, নাচলাম, গান গাইলাম। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পার্টির উন্মাদনাও বাড়ছিল। মাঝেমধ্যে কিছু পেশিবহুল ড্যান্সার এসে মেয়েদের সঙ্গে মজা করছিল। আমার বান্ধবীরা হইহই করছিল, কেউ কেউ ওদের সঙ্গে নাচতেও শুরু করল।

কিন্তু অদ্ভুতভাবে আমার মনটা বারবার অন্য কোথাও চলে যাচ্ছিল। আবছা আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা কোনো ড্যান্সারকে দেখলে আমার চোখে ভেসে উঠছিল অভীকের মুখ।

আমি ফোন বের করে ওর একটা ছবি দেখলাম। ইউনিফর্ম পরা, গম্ভীর মুখ। অথচ সেই মানুষটাই আমার চুলে মুখ ডুবিয়ে শিশুর মতো শান্তি খুঁজে পায়।

তিথি পাশে এসে বলল, “কি রে, স্বামীর কথা ভাবছিস?”

আমি মৃদু হেসে মাথা নাড়লাম।

“তুই একদম hopeless romantic!”

“হতে পারে।”

“কিন্তু এটা সুন্দর।”

রাত তখন প্রায় আড়াইটে। পার্টি শেষের দিকে। সবাই ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরছে। আমিও গাড়ির চাবি হাতে বেরিয়ে এলাম। বাইরে হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছিল। কলকাতার রাতের রাস্তা তখন প্রায় ফাঁকা। দূরে দূরে ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো পড়ে আছে।

গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট করতেই হঠাৎ অভীকের কথা খুব মনে পড়তে লাগল। ওর ডিউটি শেষ হওয়ার সময় হয়ে এসেছে। এখন হয়তো থানার কাজ গুছিয়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা তৈরি হলো। মনে হচ্ছিল যত দ্রুত সম্ভব ওর কাছে পৌঁছাতে হবে।

আমি এক্সিলারেটরে চাপ দিলাম।

ফাঁকা রাস্তা। রাতের শহর যেন ঘুমিয়ে আছে। গাড়ির কাঁচে চুল উড়ছিল। রেডিওতে ধীরে একটা পুরোনো প্রেমের গান বাজছিল।

আমি ভাবছিলাম আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার দিনটার কথা।

তখন আমি একটা বইমেলায় গিয়েছিলাম। ফেরার পথে কিছু ছিনতাইবাজ একজন বৃদ্ধকে বিরক্ত করছিল। হঠাৎ কোথা থেকে অভীক এসে হাজির হয়েছিল। সাদা শার্ট, জিন্স, কিন্তু চোখেমুখে ভয়ংকর আত্মবিশ্বাস। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব সামলে দিয়েছিল। পরে জানতে পারি ও পুলিশ অফিসার।

সেদিনই প্রথম বুঝেছিলাম, এই মানুষটার ভেতরে একটা আশ্চর্য নিরাপত্তা আছে।

আমার চিন্তা হঠাৎ ভাঙল রিয়ার ভিউ মিররে নীল-লাল আলোর ঝিলিক দেখে।

পেছনে একটা পুলিশ জিপ। সাইরেন বাজছে।

আমি চমকে উঠলাম। বুঝলাম, আমি অনেক বেশি গতিতে গাড়ি চালাচ্ছি। বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে গাড়ি থামালাম।

রাতের নির্জনতায় দূরে কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছিল। আমার বুক ধকধক করছিল।

জিপ থেকে একজন অফিসার নামলেন। লম্বা, চওড়া কাঁধ। টর্চ হাতে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। আলোটা যখন আমার মুখে পড়ল, তখনই চিনতে পারলাম—অভীক।

আমার ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

কিন্তু অভীক গম্ভীর মুখেই জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। “ম্যাডাম, স্টিয়ারিং থেকে হাত সরাবেন না। আপনি কি জানেন আপনি গতির সীমা লঙ্ঘন করেছেন?”

আমি ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে বললাম, “জানি অফিসার।”

“ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখান।”

আমি ব্যাগ থেকে লাইসেন্স বের করে দিলাম। ও সেটা হাতে নিয়ে নাটকীয়ভাবে দেখল।

“হুম… অনন্যা সেন। বয়স, ঠিকানা সব ঠিক আছে। কিন্তু এত রাতে এত তাড়া কেন?”

আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম। সেই চোখে আমি স্পষ্ট দুষ্টুমি দেখতে পাচ্ছিলাম।

আমি নিচু গলায় বললাম, “কারণ আমি আমার স্বামীকে খুব মিস করছি।”

অভীক ভ্রু তুলল। “ও আচ্ছা? স্বামী কি খুব ভয়ংকর কেউ?”

“খুব।”

“কী রকম?”

“ইউনিফর্ম পরলে তাকে দেখে আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়।”

ওর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।

আমি আরও একটু ঝুঁকে বললাম, “আর আজ রাতে তাকে খুব কাছে চাই।”

কিছুক্ষণ নীরবতা। রাস্তার ওপর হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছিল।

অভীক ধীরে ধীরে বলল, “আপনার কথার সত্যতা যাচাই করা দরকার।”

“কীভাবে করবেন অফিসার?”

ও গাড়ির দরজা খুলে দিল। “বাইরে আসুন।”

আমি গাড়ি থেকে নামলাম। কালো ড্রেসের নিচে ঠান্ডা বাতাস লাগতেই শরীর শিরশির করে উঠল। দূরে রাস্তার আলোয় অভীকের ইউনিফর্ম ঝলসে উঠছিল।

ও ধীরে ধীরে আমার কাছে এগিয়ে এল। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল পুরো পৃথিবী নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। শুধু আমাদের দুজনের নিশ্বাসের শব্দ।

অভীক আমার চুলে হাত রাখল। আঙুলের ফাঁকে চুল জড়িয়ে নিয়ে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য।

“জানো,” ও ফিসফিস করে বলল, “তোমার চুলের গন্ধ আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।”

আমি মৃদু হেসে বললাম, “তাই নাকি?”

“হ্যাঁ। ডিউটিতে যত চাপই থাকুক, তোমার কাছে এলেই সব ভুলে যাই।”

আমি ওর বুকের ওপর হাত রাখলাম। ইউনিফর্মের নিচে ওর দ্রুত হৃদস্পন্দন অনুভব করতে পারছিলাম।

“আজ তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছে,” আমি বললাম।

অভীক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “একটা কেস নিয়ে সারাদিন মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু তোমাকে দেখার পর সব ঠিক লাগছে।”

আমি ওর টাই ঠিক করে দিলাম। “তুমি জানো, তুমি না থাকলে আমিও ঠিক থাকি না?”

ও আমার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। সেই স্পর্শে বুকের ভেতর উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল।

হঠাৎ অভীক আমাকে দুহাতে তুলে গাড়ির বনেটের ওপর বসিয়ে দিল। আমি অবাক হয়ে হেসে উঠলাম।

“অফিসার, এটা কিন্তু অনডিউটি রোমান্স!”

“আমি শুধু নিশ্চিত হচ্ছি আপনি নিরাপদ আছেন।”

আমি ওর গলা জড়িয়ে ধরলাম। রাতের ঠান্ডা বাতাসে ওর শরীরের উষ্ণতা আরও গভীর লাগছিল।

আমরা অনেকক্ষণ গল্প করলাম। কলেজ জীবনের স্মৃতি, প্রথম ডেট, প্রথম ঝগড়া—সবকিছু।

অভীক বলল, “মনে আছে, প্রথমবার তুমি আমার বাইকে উঠতে ভয় পাচ্ছিলে?”

আমি হেসে বললাম, “কারণ তুমি খুব জোরে চালাচ্ছিলে!”

“আর আজ তুমি নিজেই এত স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছিলে।”

“কারণ তখন আমি তোমার প্রেমে পড়িনি।”

“আর এখন?”

আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “এখন আমি তোমার প্রেমে ডুবে আছি।”

ও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নিচু গলায় বলল, “অনন্যা, আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে। আমার কাজ বিপজ্জনক। কখন কোন পরিস্থিতি আসে বলা যায় না। কিন্তু একটা কথা জানি—আমি যতদিন বাঁচব, ততদিন তোমাকে এভাবেই ভালোবাসব।”

ওর গলায় এমন এক আন্তরিকতা ছিল যে আমার চোখ ভিজে উঠল।

আমি ধীরে বললাম, “তুমি যখন ডিউটিতে থাকো, আমি মাঝে মাঝে খুব ভয় পাই।”

অভীক আমার হাত চেপে ধরল। “ভয় পেও না। আমি সবসময় তোমার কাছেই ফিরব।”

“প্রমিস?”

“প্রমিস।”

রাস্তার ওপরে তখন হালকা কুয়াশা নামতে শুরু করেছে। দূরে কোথাও একটা ট্রেনের শব্দ ভেসে এল। শহরটা ঘুমিয়ে আছে, অথচ আমাদের ছোট্ট পৃথিবীটা তখন জেগে উঠেছে ভালোবাসার আলোয়।

অভীক আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “তোমার বান্ধবীরা নিশ্চয়ই ভাবছে তুমি বাড়ি পৌঁছে গেছ।”

“আর তুমি?”

“আমি ভাবছি, আমার স্ত্রীকে নিয়ে এখনই কোথাও পালিয়ে যাই।”

“কোথায়?”

“সমুদ্রের ধারে। যেখানে শুধু তুমি আর আমি থাকব।”

আমি হেসে ফেললাম। “তুমি ইউনিফর্ম ছেড়ে এত রোমান্টিক কথা বলো কীভাবে?”

“কারণ তোমার সঙ্গে থাকলে আমি শুধু পুলিশ অফিসার থাকি না। আমি তখন শুধু তোমার অভীক।”

ওর এই কথাটা শুনে আমার বুক ভরে গেল।

আমি বললাম, “জানো, আজ পার্টিতে সবাই খুব মজা করছিল। কিন্তু এত মানুষের মাঝেও আমি শুধু তোমাকেই মিস করেছি।”

“সত্যি?”

“হুম। কারণ পৃথিবীর যেকোনো উত্তেজনার চেয়ে তোমার পাশে শান্ত হয়ে বসে থাকা অনেক বেশি সুন্দর।”

অভীক ধীরে ধীরে আমার গাল ছুঁয়ে দিল। “তুমি কখনো বুঝতে পারবে না তুমি আমার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।”

“চেষ্টা করতে পারি।”

ও হেসে উঠল। সেই হাসিটা আমি ভীষণ ভালোবাসি। খুব কম মানুষই ওর এই হাসি দেখতে পায়। থানায় সবাই ওকে কঠিন, রাগী অফিসার হিসেবেই চেনে। কিন্তু আমি জানি, এই মানুষটার হৃদয় অসম্ভব কোমল।

হঠাৎ ওয়্যারলেসে একটা শব্দ ভেসে এল। অভীক বিরক্ত মুখে তাকাল। ডিউটির ডাক।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। “যেতে হবে?”

“হুম।”

ও একটু থেমে বলল, “তবে তার আগে…”

ও আমার কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। সেই ছোট্ট স্পর্শের মধ্যেও এত ভালোবাসা ছিল যে আমার চোখ বন্ধ হয়ে এল।

অভীক তারপর নিজের ইউনিফর্ম ঠিক করল। আবার সেই গম্ভীর অফিসার। কিন্তু চোখের কোণে এখনো উষ্ণতা রয়ে গেছে।

“এবার সাবধানে বাড়ি যান ম্যাডাম,” ও বলল। “আর গতি নিয়ন্ত্রণে রাখবেন।”

আমি মুচকি হেসে বললাম, “জি অফিসার।”

আমি গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিলাম। অভীক জিপের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ওকে অসম্ভব সুন্দর লাগছিল।

গাড়ি চালাতে চালাতে বারবার রিয়ার ভিউ মিররে ওকে দেখছিলাম। যতক্ষণ না ও দৃষ্টির বাইরে চলে গেল।

বাড়িতে পৌঁছে দরজা খুলতেই নিস্তব্ধতা আমাকে ঘিরে ধরল। কিন্তু আজ সেই নীরবতাও সুন্দর লাগছিল। কারণ জানতাম, কিছুক্ষণের মধ্যেই অভীক ফিরে আসবে।

আমি ধীরে ধীরে ঘরের আলো কমিয়ে দিলাম। বারান্দার জানালা খুলে দিলাম যাতে রাতের ঠান্ডা হাওয়া ভেতরে আসে। তারপর আলমারি খুলে অভীকের প্রিয় সাদা শার্টটা বের করে বিছানার ওপর রাখলাম।

রান্নাঘরে গিয়ে দু’কাপ কফি বানালাম। অভীক ক্লান্ত হয়ে ফিরলে কফি খেতে ভালোবাসে।

ঘড়িতে তখন প্রায় চারটা। বাইরে ভোরের আলো একটু একটু ফুটতে শুরু করেছে।

আমি সোফায় বসে অভীকের অপেক্ষা করতে লাগলাম। অপেক্ষা—ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতিগুলোর একটি। যার জন্য অপেক্ষা করা হয়, সে যদি সত্যিই প্রিয় হয়, তাহলে প্রতিটা মিনিটও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কিছুক্ষণ পর দরজার বাইরে চাবির শব্দ পেলাম। আমার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।

দরজা খুলে অভীক ভেতরে ঢুকল। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু আমাকে দেখেই মুখে শান্তি নেমে এল।

“এখনো জেগে আছ?” ও জুতো খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করল।

আমি কফির কাপ এগিয়ে দিলাম। “তোমার জন্য।”

অভীক কাপটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড শুধু আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

“কী দেখছ?”

ও ধীরে বলল, “আমার বাড়ি।”

আমার বুকটা হঠাৎ ভরে গেল।

আমি ওর কাছে গিয়ে মাথাটা ওর বুকে রাখলাম। বাইরে তখন ভোরের আলো আরও পরিষ্কার হচ্ছে। একটা নতুন সকাল জন্ম নিচ্ছে।

অভীক আমার চুলে মুখ ডুবিয়ে গভীর নিশ্বাস নিল। তারপর খুব আস্তে বলল, “আজকের রাতটা আমি কোনোদিন ভুলব না।”

আমি চোখ বন্ধ করে ওকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম।

হয়তো প্রেম আসলে এমনই। কখনো গতির নেশা, কখনো অপেক্ষার কষ্ট, কখনো নির্জন রাস্তার পাশে চুরি করা কয়েকটা মুহূর্ত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব পথ এসে মিশে যায় একজন মানুষের কাছেই—যার বুকে মাথা রাখলে মনে হয়, পৃথিবীর সব ঝড় থেমে গেছে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দুপুরের ভালবাসা

  অফিসের ব্যস্ত পরিবেশের মধ্যেও দীপকের দিকে তাকালে হৃদয়ের গভীরে এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করত সায়নার। কয়েক সপ্তাহ হলো তাদের বন্ধুত্ব একটু ভিন্ন মোড় নিয়েছে, কিন্তু সায়না জানে—এই সম্পর্ক তার জীবনকে বদলে দেবে চিরদিনের জন্য। সবকিছু শুরু হয়েছিল এক দুপুরের বিরতিতে। দীপক সায়নাকে বলল, "চলো, ব্যাংকে যেতে হবে, তুমি সঙ্গ দেবে?" সায়না কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেল। দীপকের গাড়িতে উঠতেই সে অনুভব করল এক অদ্ভুত উত্তেজনা, এক মিষ্টি টান। অফিসে ব্যস্ততার কারণে সারাদিন ওদের মধ্যে খুব কম কথাই হয়, তাই দীপকের সঙ্গে একান্তে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে ওর মন আনন্দে নেচে উঠল। ড্রাইভের সময় দীপকের দৃঢ় হাতে স্টিয়ারিং চাকা ধরার ভঙ্গিটা সায়নার মনে একরকম শিহরণ জাগাল। ওর মনের মাঝে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করছিল। গাড়িতে বসে সে দীপকের দিকেই তাকিয়ে রইল। দীপক ব্যাংকে কাজ সেরে যখন ফিরে এল, তখন ওর হেঁটে আসার দৃশ্য দেখে সায়নার বুকের ভিতর ধকধক করতে লাগল। দীপকের সুগঠিত শরীর, চোখের সেই গভীরতা—সব মিলিয়ে ও যেন এক মোহময় মানুষ। গাড়িতে উঠে দীপক একঝলক তাকিয়েই বুঝতে পারল সায়নার মনের অবস্থা। — "কী হলো? চুপ করে আছো কেন?...

অন্তহীন তৃষ্ণা: হৃদয়ের এক অবাধ্য উপাখ্যান

সূচনা: বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা ঢাকা শহরের ধুলোবালি আর ব্যস্ততার মাঝেও কিছু মুহূর্ত আসে যা জীবনকে আমূল বদলে দেয়। নীলার জীবনে হেনরি (সায়েম) ছিল সেই কালবৈশাখী ঝড়ের মতো—অপ্রত্যাশিত কিন্তু অনিবার্য। তাদের পরিচয়ের পর থেকে গত তিন মাসে নীলা এক অন্য জগতে বাস করছে। সায়েমকে দেখার পর থেকে তার ভেতরে এমন এক সুপ্ত কামনার জন্ম হয়েছে, যা সে আগে কখনও অনুভব করেনি। গত সাত মাস কোনো পুরুষের ছোঁয়া না পাওয়া শরীরটা যেন কেবল সায়েমের অপেক্ষাতেই ছিল। নীলা জানত না সায়েমের মধ্যে কী এমন জাদুকরী শক্তি আছে, কিন্তু তার গভীর চোখের চাউনি আর গম্ভীর কণ্ঠস্বর নীলার দীর্ঘদিনের সাজানো ‘সংকল্প’ বা 'রেজোলিউশন' ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। প্রথম রাতের সেই উন্মাদনা সেদিন ছিল এক মেঘলা রাত। নীলার ড্রয়িংরুমে বসে তারা কফি খাচ্ছিল। নীলার মনে কোনো অভিসন্ধি ছিল না; সে কেবল সায়েমের সান্নিধ্য চেয়েছিল। কিন্তু সায়েম যখন কাছে এসে নীলার কপালে আলতো করে চুমু খেল এবং খুব ধীর স্বরে কথা বলতে শুরু করল, নীলা যেন সম্মোহিত হয়ে গেল। সায়েমের পুরুষালি সুবাসে নীলা মাতাল হয়ে যাচ্ছিল। নীলা নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু সায়েমের হাতের ছোঁয়া যখন তার ...

रंग, प्रेम और कला: एक अधूरी दास्तान | Hindi Romantic Story for Artists

कला एक ऐसी भाषा है जिसकी कोई सीमा नहीं होती। यह भावनाओं को, छुअन को और रंगों को एक ऐसे कैनवास पर उकेरती है जो शब्दों से परे होता है। भारत जैसे देश में, जहाँ कला और संस्कृति की जड़ें बहुत गहरी हैं, प्रेम को अक्सर एक आध्यात्मिक और दिव्य रूप में देखा गया है। लेकिन कभी-कभी, दो अलग-अलग पीढ़ियों, दो अलग-अलग दृष्टिकोणों के बीच का प्रेम भी रंगों की तरह आपस में घुल-मिल जाता है। यह कहानी है एक ऐसे चित्रकार की, जिसकी उम्र के इस पड़ाव पर कला ही उसका सब कुछ थी, और एक ऐसी युवा लड़की की जो रंगों की दुनिया में अपनी पहचान बनाना चाहती थी। पहला अध्याय: कला की दुनिया और मुलाकात मैं लगभग पैंतीस साल का हूँ और बारह साल की उम्र से कला और रंगों की दुनिया में डूबा हुआ हूँ। मेरी आँखों ने रंगों के अनगिनत शेड्स देखे हैं, लेकिन जब आप एक ऐसे शहर में रहते हैं जहाँ युवा और ऊर्जावान छात्र-छात्राएं कला सीखने आते हैं, तो जीवन का नजरिया थोड़ा बदल जाता है। यहाँ एक प्रसिद्ध कला महाविद्यालय है, जहाँ के छात्रों के पास अभी सीखने के लिए बहुत कुछ है। लेकिन हर नए सेमेस्टर के साथ, जीवन में कुछ नई ऊर्जा, कुछ नए रंग और कुछ ताज़गी जर...