বর্ষার শেষভাগের এক সন্ধ্যা। ঢাকার আকাশে তখন ধূসর মেঘের ভেলা, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের চিকচিক আলো যেন শহরের কংক্রিটের দেয়ালগুলোকে আরও নিঃসঙ্গ করে তুলছিল। রাস্তার ধারে বৃষ্টিভেজা কদমফুলের গন্ধ ভেসে আসছিল বাতাসে। এই শহরটাকে নন্দিনী কখনও খুব ভালোবাসতে পারেনি, কিন্তু আজকে তার মন অদ্ভুত রকমের হালকা আর উচ্ছ্বসিত লাগছিল।
কারণ আজ রাতটা ছিল শুধুই তার আর অর্ণবের জন্য।

অর্ণব একজন দূরপাল্লার ট্রাকচালক। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে মালপত্র পৌঁছে দেওয়াই তার কাজ। কখনও চট্টগ্রাম, কখনও সিলেট, কখনও খুলনা—রাস্তাই যেন তার দ্বিতীয় ঘর। মাসের বেশিরভাগ সময় সে বাড়ির বাইরে থাকে। তাই যখনই সে ঢাকায় ফেরে, নন্দিনীর মনে হয় জীবনের সব রঙ যেন আবার ফিরে এসেছে।
আজও সেই রকমই একটি দিন হওয়ার কথা ছিল।
বিকেল থেকেই নন্দিনী নিজেকে সাজাতে শুরু করেছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে হালকা কার্ল করছিল সে। খুব বেশি সাজগোজ তার পছন্দ নয়, কিন্তু অর্ণব সবসময় বলত, “তুমি যখন একটু লাল লিপস্টিক পরো, তোমাকে দেখে আমার পুরো পৃথিবী থেমে যায়।”
সেই কথাটা মনে করেই আজ সে ঠোঁটে গাঢ় লাল রঙ ছুঁইয়ে দিয়েছিল।
একসময় নিজের ছোট্ট গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে জ্যাম, হর্নের শব্দ, মানুষের ব্যস্ততা—সবকিছু আজ যেন তার কাছে দূরের কোনো শব্দের মতো লাগছিল। তার মন জুড়ে ছিল কেবল অর্ণব।
গাড়ি চালাতে চালাতে সে কল্পনা করছিল—অর্ণব দরজা খুলবে, অবাক হয়ে তাকাবে, তারপর হয়তো হাসতে হাসতে তাকে জড়িয়ে ধরবে। সেই উষ্ণ আলিঙ্গনের জন্যই যেন সে এতদিন অপেক্ষা করে আছে।
কিন্তু অর্ণবের বাসার সামনে পৌঁছে তার বুকটা ধক করে উঠল।
বাড়ির সামনের খোলা জায়গাটায় ট্রাকটা নেই।
অর্ণবের সেই বিশাল নীল রঙের ট্রাক, যেটা দূর থেকেই চেনা যায়, সেটার কোনো চিহ্ন নেই।
মুহূর্তেই নন্দিনীর মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
সে গাড়ির ভেতরেই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। বৃষ্টির ফোঁটা উইন্ডশিল্ডে পড়ছিল, আর ওয়াইপার সেগুলো মুছে দিচ্ছিল অবিরাম। মনে হচ্ছিল তার সমস্ত উচ্ছ্বাসও যেন ঠিক এভাবেই ধুয়ে যাচ্ছে।
“হয়তো আবার কোথাও আটকে গেছে…” সে নিজেকেই ফিসফিস করে বলল।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ি থেকে নামল সে। তবুও অর্ণবের দেওয়া চাবিটা দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। হয়তো অপেক্ষা করাই ভালো।
ঘরে ঢুকতেই অর্ণবের পরিচিত গন্ধটা নন্দিনীর নাকে এসে লাগল—হালকা ডিজেলের গন্ধ, পুরুষালী পারফিউম আর পুরোনো কাঠের মিশ্র একটা ঘ্রাণ। এই গন্ধটা সে ভীষণ ভালোবাসে।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।
হঠাৎ তার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এল।
মনখারাপের মেঘটা যেন সঙ্গে সঙ্গে কেটে গেল।
সে ধীরে ধীরে হাসল।
“ঠিক আছে মিস্টার অর্ণব,” নিজের মনেই বলল সে, “তুমি যদি দেরি করো, তাহলে তোমার জন্য একটা চমক অপেক্ষা করবে।”
প্রথমেই সে রান্নাঘরের দিকে গেল। কারণ সে জানে, অর্ণব যত ক্লান্তই থাকুক, বাড়ি ফিরে সবার আগে ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা জল খোঁজে।
ফ্রিজের দরজায় একটা ছোট্ট নোট লাগিয়ে দিল সে।
“তোমার জন্য একটা সন্ধ্যা জমিয়ে রেখেছি। খুঁজে নাও আমাকে। — নন্দিনী”
তারপর সে ড্রইংরুমে এসে চারপাশ গুছিয়ে নিতে লাগল। সোফার কুশন ঠিক করল, টেবিলের উপর ছড়িয়ে থাকা ম্যাগাজিন সরাল। জানালার পাশে রাখা ছোট্ট গাছগুলোর পাতায় জমে থাকা ধুলোও মুছে দিল যত্ন করে।
বাইরে তখন মৃদু বৃষ্টি নামছে।
ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা।
নন্দিনী উপরে শোবার ঘরে উঠে গেল।
এই ঘরটাই তাদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। অর্ণব যখন বাসায় থাকে, তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা এখানে গল্প করে কাটায়। কখনও সিনেমা দেখে, কখনও পুরোনো স্মৃতি নিয়ে হাসাহাসি করে।
আজ ঘরটাকে অন্যরকম করে সাজাতে ইচ্ছে হলো তার।
সে আলমারি থেকে ছোট ছোট সুগন্ধি মোমবাতি বের করল। বিছানার দুপাশে, জানালার কাছে, ড্রেসিং টেবিলের সামনে একে একে জ্বালিয়ে দিল।
অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো ঘরে নরম সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়ল।
মনে হচ্ছিল কোনো সিনেমার দৃশ্য।
ঘরের এক কোণে রাখা ক্যামেরাটার দিকে তাকিয়ে নন্দিনীর মুখে আবার হাসি ফুটল।
এই ক্যামেরাটা অর্ণব কিনেছিল অনেক আগে। ওদের ছোট ছোট স্মৃতি ধরে রাখার জন্য। কখনও রান্না করার ভিডিও, কখনও বৃষ্টির দিনে গান গাওয়া, কখনও শুধু দুজনে একসঙ্গে হাসাহাসি—সবকিছুই জমা আছে সেখানে।
নন্দিনী ক্যামেরাটা ট্রাইপডে বসিয়ে বিছানার দিকে ফোকাস করল।
তারপর মিউজিক সিস্টেমটা অন করতেই ধীরে ধীরে একটা নরম রোমান্টিক গান ভেসে উঠল।
সুরের মূর্ছনায় ঘরটা আরও আবেশময় হয়ে উঠল।
নন্দিনী ধীরে ধীরে নিজের ওড়নাটা খুলে পাশে রাখল। তারপর আলমারি থেকে একটা কালো সিল্কের গাউন বের করল। গাউনটা অর্ণবের খুব পছন্দের।
গাউন পরে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই সে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করল যেন।
চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে লাল রঙ, খোলা চুল আর কালো সিল্কের পোশাক—নিজেকে আজ তার অন্যরকম সুন্দর লাগছিল।
সে ক্যামেরা অন করল।
প্রথমে একটু লজ্জা লাগছিল। তারপর ধীরে ধীরে সে স্বাভাবিক হয়ে গেল। যেন ক্যামেরার ওপাশে অর্ণব দাঁড়িয়ে আছে।
মিউজিকের তালে তালে সে ধীরে ধীরে নাচতে লাগল।
তার চলাফেরায় ছিল কোমলতা, চোখের চাহনিতে ছিল অপেক্ষা।
কখনও জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির দিকে তাকাল, কখনও বিছানায় বসে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
একসময় সে ক্যামেরার খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি যদি এখন এখানে থাকতে…”
কথাগুলো বলেই সে নিজেই হেসে ফেলল।
অর্ণব যদি এখন এটা দেখত, নিশ্চয়ই পাগল হয়ে যেত।
সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল।
রাত আটটা।
তারপর নয়টা।
তবুও অর্ণবের কোনো খবর নেই।
তবুও আজ নন্দিনীর মন খারাপ হচ্ছিল না। বরং এই অপেক্ষাটুকুও যেন ভালো লাগছিল।
শেষ পর্যন্ত ভিডিও বন্ধ করে সে নিচে নেমে এল। মেমোরি কার্ডটা খুলে টিভির পাশে রেখে দিল। তার নিচে আরেকটা ছোট্ট নোট লিখল—
“একলা অপেক্ষার গল্প। শুধু তোমার জন্য।”
তারপর ক্লান্ত শরীরে আবার উপরে উঠে এল।
বাইরে তখন বৃষ্টি আরও বেড়েছে।
বিছানায় শুয়ে নন্দিনী ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল, অর্ণব হঠাৎ দরজা খুলে ঢুকবে।
কিন্তু অপেক্ষা করতে করতেই কখন যে তার চোখ লেগে গিয়েছিল, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
হঠাৎ এক উষ্ণ স্পর্শে তার ঘুম ভাঙল।
প্রথমে সে বুঝতেই পারল না কোথায় আছে।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই দেখল—অর্ণব।
অর্ণব খুব কাছে ঝুঁকে আছে।
ভেজা চুল, ক্লান্ত চোখ, কিন্তু মুখভর্তি সেই পরিচিত হাসি।
নন্দিনীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“তুমি… কখন এলে?” ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলল সে।
অর্ণব মৃদু হেসে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
“অনেকক্ষণ হলো,” সে ফিসফিস করে বলল। “তোমার চমকটা দেখছিলাম।”
নন্দিনী লজ্জা পেয়ে মুখ লুকাতে গেল, কিন্তু অর্ণব তার হাত ধরে ফেলল।
“জানো,” অর্ণব বলল, “রাস্তার হাজার ক্লান্তির পর যখন বাসায় ফিরি, তখন মনে হয় পৃথিবীতে কেউ যদি সত্যি আমার জন্য অপেক্ষা করে, সেটা শুধু তুমি।”
নন্দিনীর চোখ ভিজে উঠল।
অর্ণব ধীরে ধীরে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল।
বাইরে বৃষ্টির শব্দ, ঘরের মোমবাতির আলো আর দুজন মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরের নীরব মিলন—সবকিছু মিলিয়ে মুহূর্তটা অবাস্তব সুন্দর লাগছিল।
একসময় অর্ণব হেসে বলল,
“তবে একটা সমস্যা আছে।”
“কী সমস্যা?” নন্দিনী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
“তোমার ভিডিওতে একটা জিনিসের কমতি ছিল।”
“কী?”
অর্ণব আরও কাছে ঝুঁকে এল।
“আমি।”
নন্দিনী হেসে ফেলল।
অর্ণব তখন ঘরের কোণের ক্যামেরাটার দিকে তাকাল। তারপর ধীরে গিয়ে সেটাকে আবার অন করল।
“আজকের রাতটা শুধু মনে রাখলেই হবে না,” সে বলল, “সংরক্ষণও করতে হবে।”
নন্দিনী মাথা নাড়ল।
তারপর ধীরে ধীরে অর্ণবের বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল।
অনেকদিনের অপেক্ষা, অভিমান, দূরত্ব—সব যেন গলে যাচ্ছিল সেই উষ্ণতায়।
তারা দীর্ঘসময় গল্প করল।
অর্ণব তার পথের গল্প বলতে লাগল—কীভাবে সিলেটের পাহাড়ি রাস্তায় ঝড়ের মধ্যে ট্রাক চালাতে হয়েছিল, কীভাবে মাঝরাতে রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে বসে সে নন্দিনীকে মিস করেছিল।
নন্দিনীও বলল তার একাকিত্বের কথা।
“তুমি না থাকলে এই শহরটা খুব ফাঁকা লাগে,” সে ধীরে বলল।
অর্ণব তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল।
“আর কিছুদিন,” সে বলল, “তারপর এত দূরে দূরে থাকতে হবে না।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। আমি ভাবছি ঢাকার ভেতরেই একটা কাজ নেব।”
নন্দিনী অবাক হয়ে তাকাল।
“তুমি তো ট্রাক চালানো খুব ভালোবাসো।”
অর্ণব হেসে বলল, “ভালোবাসি। কিন্তু তোমাকে আরও বেশি ভালোবাসি।”
এই ছোট্ট কথাটাই নন্দিনীর হৃদয় ভরে দিল।
রাত আরও গভীর হলো।
মোমবাতিগুলোর আলো ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছিল।
বৃষ্টির শব্দও কমে গেছে।
একসময় দুজনে পাশাপাশি শুয়ে রইল।
নন্দিনী অর্ণবের বুকের উপর মাথা রেখে তার হৃদস্পন্দন শুনছিল। এই শব্দটা তার সবচেয়ে প্রিয়।
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
“তা বলো, আমরা কি আগের ভিডিওটা দেখব?”
নন্দিনী চোখ তুলে তাকাল।
“হয়তো,” সে দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল।
“হয়তো মানে?”
“হয়তো তার চেয়েও সুন্দর কিছু নতুন স্মৃতি তৈরি করব।”
অর্ণব হেসে উঠল।
তারপর ঘরের আলো আরও ম্লান হয়ে এল, আর বাইরে ভেজা শহরের নিস্তব্ধতার মধ্যে দুটো ভালোবাসার মানুষ হারিয়ে গেল নিজেদের ছোট্ট পৃথিবীতে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন