![]() |
| কাশফুল, বৃষ্টি আর পাহাড়ের মাঝে গভীর ভালোবাসার এক অপূর্ব মুহূর্ত। |
শরতের শেষ বিকেল। পাহাড়ের বুকজুড়ে তখন কুয়াশার নরম পরত নেমে এসেছে। আকাশে ভেসে থাকা সাদা মেঘগুলো যেন ধীরে ধীরে পাহাড়ের গায়ে মিশে যাচ্ছিল। দূরে কোথাও ঝরনার কলকল শব্দ, আর বাতাসে ভেসে আসা ভেজা ঘাসের গন্ধ—সব মিলিয়ে পৃথিবীটা যেন এক স্বপ্নময় ছবির মতো লাগছিল।
আমি আর ডেভিড সেই পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটছিলাম। পায়ের নিচে নরম মাটি, পাশে কাশফুলের সাদা ঢেউ। সূর্যের শেষ আলো তখন পাহাড়ের চূড়ায় লেগে সোনালি আভা তৈরি করেছে। ডেভিডের হাতটা শক্ত করে ধরে ছিলাম আমি। ওর হাতের উষ্ণতা যেন আমার বুকের ভেতর পর্যন্ত ছড়িয়ে যাচ্ছিল।
ডেভিড হঠাৎ থেমে গেল। আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— “জানো, এই জায়গাটা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা হয়ে গেছে।”
আমি মুচকি হেসে বললাম,
— “কারণ?”
ও একটু ঝুঁকে এসে আমার চোখের দিকে তাকাল।
— “কারণ এখানে তুমি আছ।”
ওর কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতর কেমন এক নরম অনুভূতি জন্ম নিল। আমি চোখ নামিয়ে ফেললাম। এত সহজভাবে কেউ কখনও আমাকে ভালোবাসার কথা বলেনি। আমার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে দায়িত্ব আর বাস্তবতার কঠিন দেয়ালের ভেতরে। সেখানে ভালোবাসা ছিল, কিন্তু তার প্রকাশ ছিল না। অনুভূতি ছিল, কিন্তু তার কোনো ভাষা ছিল না।
ডেভিডের সঙ্গে পরিচয়ের পর প্রথমবার আমি বুঝেছিলাম, ভালোবাসা মানে কেবল কারও পাশে থাকা নয়। ভালোবাসা মানে এমন একজন মানুষকে পাওয়া, যার কাছে নিজের সব দুর্বলতা নিয়েও নির্ভয়ে দাঁড়ানো যায়।
আমরা পাহাড়ের চূড়ার দিকে এগোতে লাগলাম। উপরে উঠতেই একটা বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা চোখে পড়ল। মাঝখানে বিশাল এক পাথর, যেন প্রকৃতি নিজ হাতে বানিয়ে রেখেছে দুজন মানুষের বসার জন্য। পাথরটা রোদের তাপে উষ্ণ হয়ে ছিল।
ডেভিড আমার হাত ধরে সেখানে বসাল। বাতাস তখন আরও ঠান্ডা হয়ে আসছিল। দূরে আকাশে জমাট মেঘের ভেতর সূর্যের আলো ঢুকে অদ্ভুত রঙের খেলা তৈরি করছিল—কমলা, গোলাপি আর হালকা বেগুনির মিশ্রণ।
আমি ধীরে ধীরে পাথরের ওপর গা এলিয়ে দিলাম। ওপরে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল পুরো আকাশটা যেন আমাদের জন্যই সাজানো।
ডেভিড পাশে বসে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিল।
— “তুমি আজ খুব চুপচাপ।”
আমি ওর দিকে তাকালাম।
— “কিছু মুহূর্ত থাকে না, যেগুলো শব্দে নষ্ট করতে ইচ্ছে করে না?”
ও মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল,
— “হ্যাঁ। আর এই মুহূর্তটা ঠিক তেমন।”
হঠাৎ করেই পাহাড়ের ওপর এক পশলা বৃষ্টি নেমে এলো। ছোট ছোট ফোঁটা এসে পড়তে লাগল আমাদের গায়ে। বৃষ্টিটা ছিল নরম, উষ্ণতার ভেতরে মিশে থাকা শীতলতার মতো।
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যখন আমার মুখে এসে পড়ছিল, তখন মনে হচ্ছিল বহুদিনের ক্লান্তি ধুয়ে যাচ্ছে। ডেভিড আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ওর চোখে এমন এক মায়া ছিল, যা আমাকে প্রতিবার নতুন করে দুর্বল করে দেয়।
ও আলতো করে আমার গাল ছুঁয়ে বলল,
— “তুমি জানো না, তোমাকে এভাবে দেখলে আমার কেমন লাগে।”
আমি চোখ খুললাম।
— “কেমন লাগে?”
ডেভিড কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর খুব ধীরে বলল,
— “মনে হয় পৃথিবীর সব শান্তি এসে তোমার ভেতরে লুকিয়ে আছে।”
আমার বুকটা কেঁপে উঠল।
বৃষ্টি তখন একটু বেড়েছে। ভেজা চুলগুলো কপালে লেগে ছিল। ডেভিড হাত বাড়িয়ে সেগুলো সরিয়ে দিল। ওর আঙুলের ছোঁয়ায় শরীরের ভেতর শিহরণ খেলে গেল।
আমরা অনেকক্ষণ কোনো কথা বলিনি।
কেবল একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
সেই নীরবতার ভেতরেও কত কথা ছিল!
আমার মনে পড়ছিল প্রথম দেখা হওয়ার দিনটা। ঢাকার এক ছোট্ট বুক ক্যাফেতে পরিচয় হয়েছিল আমাদের। সেদিন বাইরে ভারী বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি এক কোণে বসে বই পড়ছিলাম। হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেলে সবাই বিরক্ত হচ্ছিল, কিন্তু ডেভিড তখন মোমবাতির আলোয় বসে গিটার বাজাতে শুরু করেছিল।
আমি এখনও মনে করতে পারি সেই সুর।
অদ্ভুত শান্ত একটা সুর।
সেদিনই প্রথম মনে হয়েছিল, এই মানুষটার ভেতরে অন্যরকম কিছু আছে।
এরপর ধীরে ধীরে কথা, বন্ধুত্ব, তারপর ভালোবাসা।
ডেভিড কখনও আমাকে বদলে দিতে চায়নি। বরং আমার ভেতরের হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকে খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।
বৃষ্টির শব্দে হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এলাম।
ডেভিড আমার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। দীর্ঘ, ধীর একটা চুম্বন।
সেই চুম্বনে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না। ছিল নিরাপত্তা। ছিল গভীর ভালোবাসা।
আমি ওর শার্টের কলার শক্ত করে ধরলাম।
ও ফিসফিস করে বলল,
— “তুমি কি জানো, আমি তোমাকে ছাড়া এখন নিজের জীবন কল্পনাও করতে পারি না?”
আমার চোখ ভিজে উঠল। বৃষ্টির পানি নাকি অনুভূতির জল—আমি বুঝতে পারছিলাম না।
আমি মাথা নিচু করে বললাম,
— “আমি ভয় পাই।”
ডেভিড অবাক হয়ে তাকাল।
— “কিসের ভয়?”
— “এত সুখের। কখনও কখনও মনে হয়, এত সুন্দর কিছু হয়তো আমার জন্য না।”
ডেভিড সঙ্গে সঙ্গে আমার দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল,
— “শোনো, তোমার জীবনে যত কষ্টই থাকুক না কেন, তুমি ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য। খুব বেশি যোগ্য।”
ওর কথাগুলো আমার বুকের গভীরে গিয়ে লাগল।
আমি ধীরে ধীরে ওর কাঁধে মাথা রাখলাম।
বৃষ্টি আর পাহাড়ি বাতাসের মাঝে আমরা বসে রইলাম। চারপাশে কুয়াশা নেমে আসছিল। মনে হচ্ছিল পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো এক ছোট্ট জগতে আমরা আটকে গেছি।
ডেভিড হঠাৎ বলল,
— “চলো নাচি।”
আমি হেসে ফেললাম।
— “এখানে?”
— “হ্যাঁ, এখানে। গান ছাড়া। শুধু বৃষ্টির শব্দে।”
ও উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
আমি হাত রাখতেই ও আমাকে টেনে তুলল।
তারপর ধীরে ধীরে আমরা নাচতে শুরু করলাম। কোনো নির্দিষ্ট ছন্দ ছিল না। ছিল শুধু অনুভূতি।
বৃষ্টিভেজা পাহাড়ের ওপর, কুয়াশার ভেতরে, আমরা দুজন যেন পৃথিবীর সব নিয়ম ভুলে গিয়েছিলাম।
ডেভিডের বুকে মাথা রেখে নাচতে নাচতে আমার মনে হচ্ছিল সময় সত্যিই থেমে গেছে।
ও আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল,
— “যদি এই মুহূর্তটা চিরকাল ধরে রাখা যেত!”
আমি চোখ বন্ধ করে বললাম,
— “তাহলে আমি আর কিছু চাইতাম না।”
সূর্য তখন প্রায় ডুবে গেছে। আকাশ ধীরে ধীরে গাঢ় বেগুনি হয়ে উঠছিল। দূরে কোথাও পাহাড়ি গ্রামের ছোট ছোট আলো জ্বলতে শুরু করেছে।
আমরা আবার সেই উষ্ণ পাথরের ওপর বসে পড়লাম।
ডেভিড আমার আঙুলের ফাঁকে নিজের আঙুল জড়িয়ে নিল।
আমি বললাম,
— “তুমি কখনও আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?”
ও কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
— “মানুষ সবসময় পাশে থাকতে পারে না। কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা কখনও কাউকে ছেড়ে যায় না।”
আমি ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ওর চোখের গভীরে তখন এমন এক আন্তরিকতা ছিল, যা আমাকে নিঃশব্দে আশ্বস্ত করছিল।
হঠাৎ পাহাড়ি বাতাস জোরে বইতে শুরু করল। ঠান্ডায় আমি কেঁপে উঠলাম। ডেভিড সঙ্গে সঙ্গে নিজের জ্যাকেট খুলে আমার গায়ে জড়িয়ে দিল।
আমি হেসে বললাম,
— “তুমি ঠান্ডা লাগবে।”
— “তুমি থাকলে আমার ঠান্ডা লাগে না।”
আমি মৃদু ধাক্কা দিলাম ওকে।
— “এত সিনেমার মতো কথা বলো কেন?”
ও হেসে ফেলল।
— “কারণ তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।”
আমার গাল লাল হয়ে উঠল।
রাত ধীরে ধীরে নেমে এলো পাহাড়ে।
বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু বাতাসে এখনও ভেজা মাটির গন্ধ।
আমরা পাশাপাশি শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মেঘের ফাঁকে কয়েকটা তারা দেখা যাচ্ছিল।
ডেভিডের বুকের ওপর মাথা রেখে আমি ওর হৃদস্পন্দন শুনছিলাম।
ধুক… ধুক… ধুক…
অদ্ভুত শান্ত একটা শব্দ।
আমি ধীরে বললাম,
— “জানো, আমি ছোটবেলায় ভাবতাম ভালোবাসা মানে হয়তো কষ্ট।”
ডেভিড আমার চুলে হাত বুলিয়ে বলল,
— “আর এখন?”
আমি একটু হেসে বললাম,
— “এখন মনে হয় ভালোবাসা মানে নিরাপদ একটা আশ্রয়।”
ও আমার কপালে আবার চুমু খেল।
আমরা অনেকক্ষণ গল্প করলাম। ছোট ছোট স্বপ্নের গল্প।
একটা ছোট বাড়ি হবে পাহাড়ের কাছে।
বারান্দা ভর্তি গাছ।
বৃষ্টির দিনে কফির কাপ হাতে বসে থাকা।
রাতে একসঙ্গে তারা দেখা।
ডেভিড বলল,
— “আমি চাই তুমি প্রতিদিন এমনভাবে হাসো।”
আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম,
— “তুমি পাশে থাকলে হাসি আপনাআপনি চলে আসে।”
রাত আরও গভীর হলো।
দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। কুয়াশা নেমে পুরো পাহাড়টাকে সাদা করে ফেলেছে।
আমি ডেভিডের হাত শক্ত করে ধরলাম।
কেন জানি না, সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল এই মানুষটার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুধু এই জীবনের নয়। যেন বহু জন্মের পরিচয়।
ডেভিড আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “কী ভাবছো?”
আমি মৃদু হেসে বললাম,
— “ভাবছি, কিছু মানুষ হঠাৎ করেই জীবনে আসে, কিন্তু মনে হয় তারা সবসময়ই ছিল।”
ও চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে আমার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে দিল।
আমাদের নিশ্বাস একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল।
সেই মুহূর্তে পৃথিবীতে আর কিছু ছিল না।
ছিল শুধু পাহাড়, কুয়াশা, আর আমাদের গভীর ভালোবাসা।
অনেক রাত হয়ে গেলে আমরা নিচে নামতে শুরু করলাম।
পাহাড়ি পথটা ভিজে ছিল। আমি সাবধানে হাঁটছিলাম। ডেভিড বারবার আমার হাত শক্ত করে ধরে রাখছিল, যেন আমি পড়ে না যাই।
একসময় আমি পিছলে গেলে ও আমাকে টেনে নিজের কাছে এনে ফেলল।
আমি হেসে উঠলাম।
— “আমি ঠিক আছি!”
ও গম্ভীর মুখে বলল,
— “তোমাকে হারানোর ভয় আমি নিতে পারব না।”
আমি ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
কেউ যখন সত্যি ভালোবাসে, তখন তার চোখে সেটা স্পষ্ট দেখা যায়।
নিচে নামতে নামতে আমরা একটা ছোট কাঠের সেতুর কাছে এলাম। নিচে পাহাড়ি নদী বয়ে যাচ্ছে।
চাঁদের আলো তখন মেঘের ফাঁক দিয়ে বেরিয়েছে।
ডেভিড থেমে গিয়ে বলল,
— “একদিন আমরা আবার এখানে আসব।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— “কেন?”
ও হাসল।
— “কারণ কিছু জায়গা শুধু একবার দেখার জন্য না। কিছু অনুভূতি বারবার বাঁচতে হয়।”
আমি ওর হাত আরও শক্ত করে ধরলাম।
সেই রাতে পাহাড় থেকে নামার সময় আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন আগের মানুষটা নেই।
ভালোবাসা আমাকে বদলে দিচ্ছিল।
ডেভিড আমাকে শিখিয়েছিল, কারও কাছে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দেওয়া দুর্বলতা নয়। বরং সেটাই সবচেয়ে বড় সাহস।
পাহাড়ের নিচে পৌঁছে আমরা শেষবারের মতো পিছনে তাকালাম।
উপরে কুয়াশায় ঢাকা সেই চূড়া এখনও দেখা যাচ্ছিল।
সেখানে রয়ে গেছে আমাদের হাসি, আমাদের নীরবতা, আমাদের ভালোবাসার প্রথম গভীর সমর্পণ।
আমি মনে মনে জানতাম, বহু বছর পরেও যদি এই দিনের কথা মনে পড়ে, আমার বুক ঠিক এভাবেই কেঁপে উঠবে।
কারণ কিছু মুহূর্ত সময়ের চেয়ে বড় হয়ে যায়।
সেই শরতের বিকেলটা ঠিক তেমনই ছিল।
একটি বিকেল, যেখানে দুইটি মানুষ একে অপরকে নতুন করে খুঁজে পেয়েছিল।
একটি বিকেল, যেখানে বৃষ্টির ফোঁটায় মিশে ছিল হৃদয়ের ভাষা।
একটি বিকেল, যা চিরকাল বেঁচে থাকবে আমাদের ভালোবাসার গল্পে।
গল্পটি কেমন লাগলো? আপনার অনুভূতি কমেন্টে জানান এবং প্রিয়জনের সঙ্গে শেয়ার করুন। আরও হৃদয়ছোঁয়া বাংলা রোমান্টিক গল্প পড়তে আমাদের ব্লগটি অনুসরণ করুন।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন